শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, কাশফুলের দোলা, ভোরের শিউলির গন্ধ আর দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের আওয়াজ—এই সবকিছুর সঙ্গে বাঙালির মনে যে উৎসবের ছবি জেগে ওঠে, তার নাম দুর্গাপূজা। দেবী দুর্গার আরাধনা দেশের নানা প্রান্তেই হয়, কিন্তু বাংলায় দুর্গাপূজা যেন শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বাঙালির সামাজিক জীবন, সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, অর্থনীতি, স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছে যে দুর্গোৎসবকে বাদ দিয়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় কল্পনা করা কঠিন।
তবে আজকের এই দুর্গোৎসবের রূপ একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ধর্মীয়, পৌরাণিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ইতিহাস।
দুর্গার উপাসনার ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গেলে প্রথমেই একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—প্রাচীন দেবী-উপাসনা এবং আজকের শরৎকালের দুর্গাপূজা এক জিনিস নয়। প্রাচীন ভারতীয় ধর্ম-সংস্কৃতিতে দেবীশক্তির আরাধনা বহু আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। বিভিন্ন সময়ে ও অঞ্চলে দেবী নানা নামে ও নানা রূপে পূজিত হয়েছেন। মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গার রূপও ধীরে ধীরে সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে সুস্পষ্ট হয়েছে।
দেবীর প্রাচীন কাহিনির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক নিদর্শন পাওয়া যায় মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত দেবীমাহাত্ম্যে। সেখানে রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধির কাহিনি রয়েছে। রাজ্য হারিয়ে সুরথ এবং সংসারে সর্বস্ব হারিয়ে সমাধি ঋষি মেধার আশ্রমে আশ্রয় নেন। ঋষির কাছে দেবীর মাহাত্ম্য শুনে তাঁরা দেবীর আরাধনা করার সিদ্ধান্ত নেন। কাহিনি অনুযায়ী, তাঁরা একটি নদীর বালুময় তীরে মাটি দিয়ে দেবীর মূর্তি নির্মাণ করে পূজা ও তপস্যা করেন। দীর্ঘ সাধনার পর দেবী আবির্ভূত হয়ে তাঁদের বরদান করেন।
এরপর দুর্গাপূজার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে রামায়ণের একটি জনপ্রিয় কাহিনি—অকালবোধন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার আগে রাম শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। দেবীর আরাধনার প্রচলিত সময়ের বাইরে শরৎকালে এই পূজা হওয়ায় তা পরিচিত হয় “অকালবোধন” নামে।
তবে বাল্মীকি রামায়ণের মূল কাহিনিতে রামের শরৎকালের দুর্গাপূজার এই বিবরণ নেই। বাংলায় অকালবোধনের কাহিনিকে জনপ্রিয় করে তুলতে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে কৃত্তিবাসী রামায়ণ। পঞ্চদশ শতকের বাংলা রামায়ণ-পরম্পরায় রামের অকালবোধনের কাহিনি নতুন মাত্রা পায়। দেবীর উদ্দেশে ১০৮টি নীলপদ্ম নিবেদন, একটি পদ্ম কম পড়ায় নিজের চোখ উৎসর্গ করতে উদ্যত হওয়া এবং শেষ মুহূর্তে দেবীর আবির্ভাব—এই আবেগপূর্ণ কাহিনি বাঙালির ধর্মীয় কল্পনায় গভীর ছাপ ফেলে। ফলে শরৎকালের দুর্গাপূজা ধীরে ধীরে বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতিক আখ্যানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়।
এদিকে বাংলায় দুর্গাপূজার শাস্ত্রীয় চর্চাও যে অনেক প্রাচীন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন মধ্যযুগীয় গ্রন্থে। পরবর্তী সময়ে বিদ্যাপতি, শূলপাণি ও রঘুনন্দনের মতো পণ্ডিতদের রচনাতেও দুর্গাপূজার আচার-বিধির উল্লেখ পাওয়া যায়।
দুর্গার প্রতিমার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতীয় ভাস্কর্যে মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গার নানা রূপ দেখা যায়। কোথাও তাঁর দুই, চার বা আটটি হাত, কোথাও দশ বা তারও বেশি হাত। বাংলার পাল-সেন যুগের ভাস্কর্যেও মহিষাসুরমর্দিনী রূপের নিদর্শন রয়েছে। অর্থাৎ আজকের দশভুজা দুর্গার রূপও একদিনে সৃষ্টি হয়নি। পরবর্তী সময়ে বাঙালির শিল্পভাবনা ও ধর্মীয় কল্পনার মধ্য দিয়ে দুর্গা শুধু অসুরদলনী শক্তির প্রতীক না থেকে ধীরে ধীরে মায়ের রূপও লাভ করেন। তাঁর সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশকে একই পারিবারিক বিন্যাসে দেখানোর রীতিও বাঙালি প্রতিমার স্বাতন্ত্র্য তৈরি করে।
বাংলায় বড় আকারে দুর্গাপূজার আয়োজনের ইতিহাসে এরপর উঠে আসে তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণের নাম। প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ষোড়শ শতকের শেষভাগে তিনি অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। তাঁকে বাংলায় দুর্গাপূজার “প্রবর্তক” বলা নিয়ে মতভেদ থাকলেও, বড় আয়োজনের দুর্গাপূজার ইতিহাসে তাঁর নাম গুরুত্বপূর্ণ।
এরপর নদিয়ার ভবানন্দ মজুমদারের নামও পাওয়া যায়। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, সপ্তদশ শতকের গোড়ায়, ১৬০৬ সালের কাছাকাছি সময়ে তিনি দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। এই সময়ে বাংলার ক্ষমতাবান জমিদার ও অভিজাত পরিবারগুলির মধ্যে দুর্গাপূজা ক্রমশ সামাজিক মর্যাদা ও প্রতিপত্তি প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠতে শুরু করে।
কলকাতার দুর্গাপূজার ইতিহাসে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের বড়িশার পূজার গুরুত্ব অপরিসীম। পরিবারের ঐতিহ্য অনুযায়ী, লক্ষ্মীকান্ত রায়চৌধুরী ১৬১০ সালে বড়িশায় দুর্গাপূজার সূচনা করেন। এই পূজা আজও ঐতিহ্য মেনে অনুষ্ঠিত হয়।
তখনও সেই কলকাতা আজকের কলকাতা হয়ে ওঠেনি। শহরের বিস্তীর্ণ অংশ ছিল গ্রাম, জলাভূমি ও জঙ্গলঘেরা এলাকা। সেই সময় বড়িশার মতো অঞ্চলে বনেদি পরিবারের দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় উৎসবই ছিল না; তাকে ঘিরে গড়ে উঠত মানুষের মিলন, ভোজ, আচার এবং সামাজিক যোগাযোগের এক বিশেষ পরিসর।
ক্রমে এই বনেদি বাড়ির পূজার ধারাই বাংলার সামাজিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। একদিকে দেবীর আরাধনা, অন্যদিকে আত্মীয়-স্বজনের সমাগম, অতিথি আপ্যায়ন, গান-বাজনা ও নানা সামাজিক আয়োজন—সব মিলিয়ে দুর্গাপূজা ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর উৎসবে পরিণত হচ্ছিল।
আর এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অধ্যায়টি আসতে চলেছিল কলকাতায়।
অষ্টাদশ শতকে এসে দুর্গাপূজার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে গেল ঔপনিবেশিক কলকাতার রাজনীতি। পলাশীর যুদ্ধের পর বদলে যেতে শুরু করল বাংলার ক্ষমতার মানচিত্র। সেই পরিবর্তনের ছায়া পড়ল দুর্গোৎসবেও।
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণ দেবের দুর্গাপূজার কাহিনি এই সময়ের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, ইংরেজদের বিজয় উপলক্ষে নবকৃষ্ণ দেব তাঁর বাড়িতে অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন এবং সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ব্রিটিশ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভকে। এই পূজা পরবর্তীকালে ‘কোম্পানি পুজো’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
ইতিহাস আর লোককথার মিশেলে তৈরি এই কাহিনি আজও কলকাতার দুর্গাপূজার ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত। তবে এর মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—দুর্গাপূজা তখন আর কেবল ধর্মীয় আচারের মধ্যে আবদ্ধ ছিল না। রাজনীতি, ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা এবং নতুন গড়ে ওঠা ঔপনিবেশিক সমাজব্যবস্থার সঙ্গেও তা জড়িয়ে পড়ছিল।
এরপর কলকাতার একের পর এক বনেদি পরিবার দুর্গাপূজাকে নিজেদের পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ করে তুলল। বিশাল বাড়ির উঠোনে তৈরি হতে লাগল ঠাকুরদালান। সেখানে দেবীর আরাধনার পাশাপাশি বসত আত্মীয়-স্বজনের আসর, অতিথি আপ্যায়ন, গান-বাজনা, ভোজ এবং নানা ধরনের বিনোদনের আয়োজন।
অনেক বাড়িতে আবার ইউরোপীয় অতিথিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হতো। ফলে দুর্গাপূজা হয়ে উঠল একই সঙ্গে ধর্মীয় উৎসব, সামাজিক মিলনমেলা এবং অভিজাত জীবনের প্রদর্শনীর ক্ষেত্র।
কিন্তু এই আড়ম্বরের বাইরে তখন ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছিল অন্য এক আকাঙ্ক্ষা।
দুর্গাপূজা যদি সবার হয়, তবে তার আনন্দও কি সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায় না?
এই প্রশ্ন থেকেই ক্রমে শক্তিশালী হতে শুরু করল বারোয়ারি বা সম্মিলিত পূজার ধারণা। বাংলার গুপ্তিপাড়ায় বারোয়ারি পূজার সূচনা নিয়ে একটি বহুল প্রচলিত কাহিনি রয়েছে। যদিও সেই কাহিনির ঐতিহাসিকতা নিয়ে মতভেদ আছে, তবু সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে দুর্গাপূজার আয়োজনের ধারণাটি যে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, তারই প্রতিফলন দেখা যায় পরবর্তী সময়ে।
ঊনবিংশ শতকের শেষভাগ থেকে বিংশ শতকের গোড়ায় এসে এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুর্গাপূজা ক্রমশ বনেদি বাড়ির সীমানা পেরিয়ে বৃহত্তর জনসমাজের উৎসবে পরিণত হতে শুরু করে।
১৯১০ সালে ভবানীপুরের বলরাম বসু ঘাট রোডে সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভার উদ্যোগে যে দুর্গাপূজা শুরু হয়, সেটিকে কলকাতার প্রাচীনতম বারোয়ারি বা সম্প্রদায়ভিত্তিক পূজাগুলির অন্যতম বলে ধরা হয়। এই ধরনের উদ্যোগের ফলে দুর্গাপূজার চরিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। দেবীর সামনে দাঁড়ানোর অধিকার যেন ধীরে ধীরে কেবল জমিদারবাড়ির সদস্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছে যেতে থাকে।
আর এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দুর্গাপূজা হয়ে উঠতে থাকে সত্যিকারের জনউৎসব।
উত্তর কলকাতাতেও এই নতুন ধারার বিস্তার ঘটল। তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠল বাগবাজার। ১৯১৯ সালে নেবুবাগান বারোয়ারি হিসেবে যে পূজার সূচনা, তা পরবর্তীকালে বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসবে রূপ নেয়।
সেই সময় বাংলার সমাজে স্বদেশি আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদী চেতনারও প্রবল প্রভাব। ফলে দুর্গাপূজার মণ্ডপ ও মেলাও অনেক ক্ষেত্রে হয়ে উঠতে থাকে মানুষের মিলন এবং সামাজিক চেতনা প্রকাশের ক্ষেত্র। ধর্মীয় উৎসবের আড়ালে তৈরি হতে থাকে বৃহত্তর জনসমাজের এক নতুন যোগাযোগ।
এভাবেই দুর্গাপূজা ধীরে ধীরে বদলে গেল।
একসময় যে পূজা ছিল রাজা-জমিদার কিংবা বনেদি পরিবারের ব্যক্তিগত ঐতিহ্য, সেটিই ক্রমে হয়ে উঠল পাড়ার মানুষের উৎসব। ঠাকুরদালানের চার দেওয়াল ছেড়ে দেবী এলেন সর্বজনের মণ্ডপে।
আর এই পরিবর্তনই দুর্গাপূজাকে তার আধুনিক রূপের দিকে নিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করল।
বিংশ শতকের শেষভাগে এসে দুর্গাপূজার ইতিহাসে আবার দেখা দিল এক নতুন পরিবর্তন। এবার বদলাতে শুরু করল মণ্ডপের চেহারা।
দেবীকে ঘিরে তৈরি মণ্ডপ আর শুধু প্রতিমার আশ্রয়স্থল রইল না। ধীরে ধীরে তা হয়ে উঠল শিল্পীর কল্পনার এক বিশাল ক্যানভাস। কোথাও মণ্ডপে ফুটে উঠল গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা কোনও দৃশ্য, কোথাও উঠে এল প্রাচীন স্থাপত্যের অনুকৃতি, কোথাও লোকশিল্পের নানা রূপ। আবার কোনও কোনও পুজোয় মণ্ডপের বিষয় হয়ে উঠল পরিবেশ, নারী-নিরাপত্তা, সামাজিক বৈষম্য কিংবা সমকালীন কোনও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এইভাবেই জনপ্রিয় হয়ে উঠল ‘থিম পুজো’।
একসময়ের সাধারণ বাঁশ, কাপড় ও মাটির মণ্ডপের জায়গায় এল পরিকল্পিত শিল্পনির্মাণ। শিল্পী, স্থপতি, কারিগর, আলোকশিল্পী—অনেকের সম্মিলিত শ্রমে একটি পুজোর মণ্ডপ যেন কয়েক মাসের জন্য হয়ে উঠতে লাগল এক একটি সাময়িক শিল্পকর্ম।
এর সঙ্গে বাড়ল পুজো-প্রতিযোগিতাও। ১৯৮৫ সাল থেকে এশিয়ান পেইন্টসের ‘শারদ সম্মান’ কলকাতার দুর্গাপুজোগুলিকে পুরস্কৃত করে আসছে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংবাদপত্র, বেসরকারি সংস্থা ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের পুরস্কার এবং পৃষ্ঠপোষকতা এই প্রতিযোগিতাকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।
২০০০-এর দশকে এই প্রতিযোগিতা নতুন মাত্রা পায়। ২০০৬ সালে ‘স্নোকেম-প্রতিদিন পুজো পারফেক্ট’-এর প্রথম পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ লক্ষ ১১ হাজার ১১১ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। পুরস্কারের অর্থ, সংবাদমাধ্যমের প্রচার, দর্শকের ভিড় এবং স্পনসরশিপ—সব মিলিয়ে দুর্গাপূজা ধীরে ধীরে একটি বিশাল সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক পরিসরে পরিণত হতে থাকে।
তবে দুর্গাপূজার এই বাণিজ্যিক রূপান্তরকে কেবল অর্থের হিসাব দিয়ে দেখলে তার একটি বড় দিক চোখ এড়িয়ে যায়।
কারণ, আধুনিক মণ্ডপ অনেক সময় হয়ে উঠেছে সমাজের কথাও বলার জায়গা।
কোনও পুজো তুলে ধরেছে পরিবেশ রক্ষার বার্তা, কোনওটি নারী-নিরাপত্তার প্রশ্ন, কোনওটি শিক্ষার গুরুত্ব, আবার কোনওটি দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য বা সামাজিক বৈষম্যের মতো বিষয়কে শিল্পের ভাষায় মানুষের সামনে এনেছে। অর্থাৎ দেবীর আরাধনার পাশাপাশি দুর্গাপূজার মণ্ডপও হয়ে উঠেছে সমকালীন সমাজকে দেখার এক আয়না।
এভাবেই কয়েক শতকের পথ পেরিয়ে দুর্গাপূজা এসে দাঁড়িয়েছে এক আশ্চর্য সন্ধিক্ষণে—যেখানে একই সঙ্গে রয়েছে ধর্ম, শিল্প, লোকসংস্কৃতি, অর্থনীতি, বিনোদন এবং সামাজিক বার্তা।
আর এই দীর্ঘ যাত্রা শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দরজায়।
২০২১ সালে UNESCO-র ‘Representative List of the Intangible Cultural Heritage of Humanity’-তে ‘Durga Puja in Kolkata’ অন্তর্ভুক্ত হয়। এই স্বীকৃতি শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবের জন্য নয়; দুর্গাপূজার সঙ্গে যুক্ত মৃৎশিল্পী, কারিগর, পুরোহিত, ঢাকী, শিল্পী, পুজো কমিটি এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকেও স্বীকৃতি দিয়েছে।
আজকের দুর্গাপূজার দিকে তাকালে তাই তার মধ্যে একই সঙ্গে দেখা যায় বহু শতকের ইতিহাস।
কোথাও প্রাচীন দেবী-আরাধনার স্মৃতি, কোথাও দেবীমাহাত্ম্য-এর কাহিনি, কোথাও কৃত্তিবাসী রামায়ণের অকালবোধন। কোথাও রাজা-জমিদারের বনেদিয়ানা, কোথাও ঔপনিবেশিক কলকাতার সামাজিক ইতিহাস। আবার কোথাও বারোয়ারি ও সর্বজনীন পুজোর গণচেতনা, কোথাও থিম পুজোর শিল্পভাবনা, আর কোথাও আধুনিক বাণিজ্যিক সংস্কৃতির ছাপ।
সময় বদলেছে। বদলেছে পূজার আয়োজনও।
তবু কিছু দৃশ্য যেন বদলায়নি।
শিউলির গন্ধ, ঢাকের বাদ্য, ধুনুচির ধোঁয়া, সন্ধ্যার আরতি, সিঁদুরখেলা কিংবা বিসর্জনের মুহূর্তে বিষণ্ণ হয়ে ওঠা মন—এসবের মধ্যে আজও বেঁচে আছে সেই চিরপরিচিত দুর্গাপূজা।
আর বাঙালির কাছে দেবীও শুধু মহিষাসুরমর্দিনী নন। তিনি শক্তির প্রতীক, অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয়ের প্রতীক। আবার তিনিই শরতের কয়েক দিনের জন্য বাপের বাড়িতে ফিরে আসা ঘরের মেয়ে।
হয়তো এই কারণেই দুর্গাপূজার ইতিহাস কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবের ইতিহাস নয়।
এটি বাংলার সমাজ বদলের ইতিহাস। এটি শিল্পের বিবর্তনের ইতিহাস। এটি মানুষের একত্রিত হওয়ার ইতিহাস। আর সবচেয়ে বড় কথা, এটি সময়ের সঙ্গে একটি উৎসবের নিজেকে বারবার নতুন করে আবিষ্কার করার ইতিহাস।
প্রাচীন দেবী-আরাধনা থেকে আজকের সর্বজনীন দুর্গোৎসব—এই দীর্ঘ পথচলায় তাই ধরা পড়ে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।
শরতের আকাশে যখন আবার সাদা মেঘ ভাসে, কাশফুল দোলে, ভোরের বাতাসে শিউলির গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে, আর দূর থেকে ভেসে আসে ঢাকের শব্দ—তখন মনে হয়, ইতিহাসের সেই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে দেবী আবারও ফিরে এসেছেন।