Skip to main content
৩ আশ্বিন ১৪৩৩
রবিবার · ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আনুপূর্বী আনুপূর্বী
অতীত ও অনাগত-এর সন্ধিক্ষণে
আসন্ন অনুষ্ঠান 11 Oct 2026
Exploring The Dharma of Justice in the Sanskrit Epics
Prof Ruth Vanita
লেখা পাঠান
বন্দে মাতরম : একটি বিতর্ক
19 মিনিট পাঠ

বন্দে মাতরম : একটি বিতর্ক

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'বন্দে মাতরম' রচনার ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে কেন্দ্রীয় সরকার সারা দেশে বড় অনুষ্ঠান করেছেন এবং একটি নির্দেশিকাও জারি হয়েছে যে, সরকারি অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত 'জনগণমন'-এর আগেই 'বন্দে মাতরম' গাইতে হবে। এই নিয়ে সংসদে বিতর্কও হয়েছে। বিতর্ক সব সময়ই স্বাস্থ্যকর, যদি তা গঠনমূলক ও শুভবুদ্ধিজাত হয়। প্রসঙ্গত, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ কেন্দ্রীয় সরকার 'বন্দে মাতরম'-এর বাদ দেওয়া চারটি স্তবককে পুনরায় সংযুক্ত করার বিজ্ঞপ্তি জারি করেছেন। এই সিদ্ধান্তই বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
Sudhir Dutta
লেখক
আশ্বিন ১৪৩৩
অক্ষরের মাপ:
শেয়ার ও ফিড: RSS

​ভারতীয় মানস, বন্দে মাতরম ও শ্রীঅরবিন্দ

​'বন্দে মাতরম' ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রথমে কবিতা হিসেবে রচনা করেছিলেন, এবং পরে তাঁর উপন্যাস 'আনন্দমঠ'-এ অন্তর্ভুক্ত করেন। কবিতাটির প্রথম স্তবকে ভারতভূমি সুজলা-সুফলা মলয়জশীতলা মাতৃরূপে কল্পিত। ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক সভ্যতা চিরকাল তার দেশকে কখনও একটি সাধারণ ল্যান্ডমাস বা ভৌগোলিক মানচিত্ররূপে দেখেনি, দেখেছে এক চিন্ময় জীবন্ত সত্তারূপে। মা রূপে। এই দেশকে তো আমরা আজও মাতৃভূমিই বলি। ভারতীয় কল্পনার বিমূর্তকে মূর্ত করার এই-ই কাব্যিক ভাষা। এইভাবে গঙ্গা নদীকে গঙ্গাদেবী, জ্ঞানকে সরস্বতী বলি আমরা। বেদে সরস্বতী নদীকে অম্বিতমেরূপে আহ্বান করা হয়েছে৷ বঙ্কিমচন্দ্রের এই কবিতাটিতে স্বাভাবিকভাবেই এই মা ধীরে ধীরে ইভলভড্ হয়েছেন দেবীরূপে। এবং এই গানটি দেশের প্রতি ভালোবাসার দ্বারা এতখানি চার্জড, ফলত উদ্দীপক ও অনুপ্রেরণাময় যে, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে কার্যত এটি একটি জাতীয় মন্ত্রে পরিণত হয়ে ওঠে।

​'বন্দে মাতরম' একটি সাধারণ দেশাত্মবোধক গান থেকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রধান মন্ত্রে পরিণত করার পেছনে শ্রীঅরবিন্দের ভূমিকা ছিল অনন্য ও যুগান্তকারী। গানটিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল চালিকাশক্তিতে রূপান্তরিত করার কৃতিত্ব বহুলাংশে তাঁর। বন্দে মাতরম পত্রিকায় তাঁরই ওজস্বী লেখনী-প্রভাবে গানটি হয়ে উঠেছিল একটি অগ্নিগর্ভ 'রণধ্বনি' (Battle cry)। বিপিনচন্দ্র পাল, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ এই গানটির মাহাত্ম্য স্বীকার করেছিলেন। যতদূর জানি, রবীন্দ্রনাথ নিজেই এই গানটির সুরারোপও করেন।

তৎকালীন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক চিন্তকদের সবচেয়ে বড়ো ভুল ছিল এই বিস্মরণ যে, ভারতবর্ষের প্রকৃত পরিচয় তার ভৌগোলিক মানচিত্র বা রাজনৈতিক কাঠামো নয়। সে এক নিরবচ্ছিন্ন সভ্যতা, বহু আক্রমণ, বহু বছরের পরাধীনতা এবং রাজনৈতিক পালাবদলের পরও আজও যে এক জীবন্ত সত্তা

​১৮৯৬ সালে কলকাতা কংগ্রেস অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ এবং ১৯০৫ সালে বেনারস কংগ্রেস-অধিবেশনে বন্দে মাতরম গানটি গেয়েছিলেন সরলা দেবী চৌধুরানী।

​১৯০৬ সালে বরিশালে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায় একসঙ্গে বন্দে মাতরম মিছিলে অংশগ্রহণ করেন।

​মনে রাখা দরকার, শুরু থেকে মুসলিমরা কংগ্রেসে ছিলেন। কখনও আপত্তি জানাননি কেউ। এমনকি কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ব্যারিস্টার সৈয়দ বদরুদ্দিন তয়াবজী (১৮৪৪--১৯০৬), যিনি দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধী ছিলেন, যার অবস্থান ছিল সৈয়দ আহমেদ খানের বিপরীতে, কখনও এই গানটির বিরোধিতা করেননি।

​তাঁরা কি তখন জানতেন না যে, 'বন্দ্' ধাতু থেকে বন্দে (উত্তম পুরুষ একবচন) শব্দটি নিষ্পন্ন, যার আক্ষরিক অর্থ আমি বন্দনা, স্তব, স্তুতি বা আরাধনা করি? এর অর্থ বুঝতে তাঁদের এত বছর লেগে গেল? অথচ ইতিহাস সাক্ষী, ব্রিটিশ পুলিশের লাঠিচার্জের মুখে রক্তাক্ত ছাত্র-জনতা 'বন্দে মাতরম' ধ্বনি দিতে দিতে গর্জে উঠেছিলেন পথে-প্রান্তরে। গানটি হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার স্মারক। জাতীয়তাবাদের প্রথম ম​আনন্দমঠ ও সন্তান-দলের নেতা

​যে-কোনো আলোচনা নিরপেক্ষতা দাবি করে, যদিও নিরপেক্ষতা বলে কিছু হয় না। মানুষ পাথর বা যন্ত্র নয়। তার মন আছে। ফলে মত আছে। ইতিহাসও তাই। যাঁরা লেখেন, তাঁদের মতাদর্শ থেকে লেখেন। তবুও কিছু তথ্য আমাদের জানা দরকার।

​'আনন্দমঠ'-এ মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের চিত্রও আছে। 'যবন রাজত্ব'-কে নিন্দা করে সন্তানদলের নেতা সত্যানন্দ বলছেন, মাতৃভূমি 'যবনের পদতলে পিষ্ট' মা লক্ষ্মীহীনা হয়েছেন, দেবমন্দির ধ্বংস হয়েছে। ইত্যাদি।

​কিন্তু এ তো লেখকের মনগড়া কল্পনা নয়, ঐতিহাসিক সত্য। মন্দির-ধ্বংস করা ইসলাম-অনুমোদিত এক পবিত্র কর্ম। কোনও অমুসলমান লেখক নন, বাবর স্বয়ং সততার সঙ্গে লিপিবদ্ধ করে গেছেন আত্মজীবনী 'বাবরনামা'-তে তাঁর এইরকম অজস্র পবিত্র কর্মের ইতিবৃত্ত।

​জিয়াউদ্দিন বারানির 'তারিখ-ই-ফিরুজশাহী' এ-বিষয়ে এক প্রামাণ্য ঐতিহাসিক দলিল। এর জন্য তাঁদের আদৌ দোষারোপ করা যায় না, কারণ তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন ধর্মভীরু, ইসলামের সেবক। আর 'গজওয়া-ই-হিন্দ' তো হাদিস উল্লিখিত একটি সুপ্রসিদ্ধ ভবিষ্যৎ-বাণী। সুলতান টিপুর তরবারিতেও খোদিত আছে আত্মশ্লাঘাময় ইত্যাকার​বন্দে মাতরম ও রবীন্দ্রনাথ

​কিন্তু সত্যের চেয়েও বহুসময় ব্যবহারিক সত্য এমন বড়ো হয়ে ওঠে এবং মহত্তর সত্যের এমন ভান নিয়ে সামনে দাঁড়ায় যে, রবীন্দ্রনাথের মতো মহান মানুষও ইতিহাসের এক নির্ণায়ক মুহূর্তে একটা চটজলদি আপোসসূত্র দিতে বাধ্য হন! 'আপোসসূত্র' শব্দটি অনেকের পছন্দ না-ও হতে পারে।

​১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মহাত্মা গান্ধীর পরামর্শে দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির লক্ষ্যে 'বন্দে মাতরম' থেকে পরবর্তী চারটি স্তবককে বাদ দেওয়া হয়, এবং ১৯৫০ সালে তা সরকারিভাবে বাস্তবায়িত হয়।

​অথচ দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে। তবে আপোস কেন? কিন্তু আপোসটি করা হয়েছিল পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পরও এই দেশে থেকে যাওয়া মুসলমানদের জন্য। তাঁরা থাকুন তাঁতে আপত্তি থাকতে পারে না, আপত্তি আপোসে। যদিও বর্তমান আলোচনায় বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক, তবুও যে প্রশ্নটি মাথার ওপর চক্কর কাটে, তা হল ভারতবর্ষে থেকে যাওয়া মুসলমানদের সংখ্যা যখন পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার চেয়ে বেশি, ভারত বিভাজন হয়েছিল কার স্বার্থে? কোন ক্ষমতার লোভ, কোন ভয় ত্বরান্বিত করেছিল এই বিভাজন? প্রশ্নটি ইতিহাসের। উত্তরটি কি নিহিত আছে Transfer of Power-​রবীন্দ্রনাথের কাছে প্রশ্ন

​রবীন্দ্রনাথ শুধু একজন কবি বা আদর্শিক মানুষ ছিলেন না। তাঁর বাস্তববোধ, নিরপেক্ষতা ও অন্তর্দৃষ্টি সন্দেহাতীত। তবুও 'বন্দে মাতরম' সম্পর্কে তাঁর সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল বলে এই লেখকের মনে হয় না।

​আমরা জানি, ভারতবর্ষকে তিনি কল্পনা করেছিলেন মহামিলনের সাগরতীর বলে, যেখানে শক, হূণ ও পাঠান-মোগলরা এক দেহে লীন হয়ে গেছে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? ইসলাম-বিজিত পৃথিবীর কোনও দেশে কি তা হয়েছে? তারা আক্রমণকারী হিসেবে যে দেশে গেছে, সেই দেশের মানুষকে ধর্মান্তরিত করে লীন করে নিয়েছে তাদের দেহে, কেননা ইসলামিক ব্রাদারহুড ব্যতীত মনোলিথিক ইসলামে দ্বিতীয় ব্রাদারহুডের কল্পনাও গুনাহ। ব্যতিক্রম শুধু বিশাল ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে। সবটা পারেনি। তার কারণ বহুবিধ। সে-বিষয় আপাতত অপ্রাসঙ্গিক বিধায় আলোচনা থেকে বিরত থাকা গেল।

​এবার আমরা ধীরে ধীরে ইতিহাসের গভীরে প্রবেশ করবার চেষ্টা করব। আমরা জানি, কংগ্রেসের বেশ কিছু মুসলিম নেতা দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধী ছিলেন, যাঁদের মধ্যে ছিলেন মওলানা আবুল কালাম আজাদ, খান আবদুল গাফফার খান (সীমান্ত গান্ধী), রফি আহমেদ কিদওয়াই, সৈয়দ বদরুদ্দিন তয়াবজী, ডক্টর মুখতার আহমেদ আনসারির মতো অগ্রগণ্য নেতারা। এইসব নেতারা এই দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধে মূলত দুটি যুক্তি দিতেন। এক, ইসলাম ধর্ম ভৌগোলিক রাষ্ট্রের ভিত্তি হতে পারে না। দুই, ভারতের মুসলমানরা হাজার বছরেরও অধিক কাল এই মাটিতে মিশে এক অভিন্ন সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে, ফলে মুসলমানরা আলাদা 'জাতি' নয়, বরং বৃহত্তর 'ভারতীয় জাতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। 'পাকিস্তান', যার অর্থ পবিত্র স্থান, মওলানা আজাদের মতে ইসলাম-বিরোধী। কারণ ইসলাম কোনো ভূখণ্ডকে পবিত্র বা অপবিত্র ভাগে বিভক্ত করে না। তাঁর "India Wins Freedom" গ্রন্থে তিনি লিখেছিলেন, 'একজন হিন্দু যেমন গর্বের সঙ্গে বলতে পারেন তিনি ভারতীয় এবং হিন্দু, আমরাও সমান গর্বের সঙ্গে বলতে পারি আমরা ভারতীয় ও মুসলমান।'

​কংগ্রেসের সব অধিবেশনে, যাতে বহু সংখ্যক মুসলমান সদস্য উপস্থিত থাকতেন, 'বন্দে মাতরম' গাওয়া হত। কখনও পুরোটা, কখনও সময়াভাবে প্রথম দুটি স্তবক।

​কিন্তু আপত্তি যে ওঠেনি তা তো নয়। ১৯২৩ সালে জাতীয় কংগ্রেসের কাঁকিনাড়া অধিবেশনে। এই অধিবেশনের সভাপতি প্রখ্যাত খিলাফত নেতা মাওলানা মহম্মদ আলি প্রকাশ্য মঞ্চে পণ্ডিত বিষ্ণু দিগম্বর পলুস্করকে বন্দে মাতরম গাইতে বাধা দেন, ইসলাম-বিরোধী বলে।

​কিন্তু বিষয়টা তৎক্ষণাৎ খুব বেশি দূর না গড়ালেও, বুঝতে অসুবিধা হয় না, ১৯২০ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে খিলাফতকে যুক্ত করে গান্ধীজী রাজনীতিতে ধর্মের অনুপ্রবেশের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন, কেননা খিলাফতের সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের (১৯১৯-১৯২৪) দূরতম সম্পর্কও ছিল না। এইভাবে ধর্ম রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ বৈধতা পাওয়ার ফলে ১৯৩৭ সালে মুসলিম লিগ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বন্দে মাতরমের তীব্র বিরোধিতা শুরু করে।

​আর ব্রিটিশ সরকার এরকম এক সুযোগের অপেক্ষায় ছিল এবং এই বিরোধিতাকে তীব্র করার লক্ষ্যে তলে তলে তারা কাজ করে যাচ্ছিল। ভারত শাসন আইন (Govt. Of India Act 1935) পাস হওয়ার পর ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স ও প্রশাসনিক কর্তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, 'বন্দে মাতরম' গানটি স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল মন্ত্র হয়ে উঠেছে। তারা ১৯৩৫ সালেই গোপন সার্কুলারে মুসলমানদের মধ্যে প্রচার শুরু করে যে, 'আনন্দমঠ' উপন্যাসটি একটি ঘোরতর ইসলাম-বিরোধী বই। এবং সেই বইতে কোথায় কোথায় ইসলাম-বিরোধী প্রসঙ্গ আছে তুলে ধরলেন। উদ্দেশ্য ছিল: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে মুসলিমদের দূরে সরিয়ে রাখা এবং জাতীয় কংগ্রেসকে 'কেবলমাত্র হিন্দুদের দল' হিসেবে প্রতিপন্ন করা। এবং তাদের এই প্ররোচনা ও প্রকল্প অনেকাংশে সফল হয়েছিল। চতুর ব্রিটিশ সরকার আনন্দমঠ উপন্যাসের প্রকাশ্য সমালোচনা না করলেও, (কারণ তারা সংখ্যাগুরু হিন্দুদের বিরাগভাজন হতে চায়নি) ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের সময় 'বন্দে মাতরম' গান নিয়ে এক বিশাল সাম্প্রদায়িক বিতর্কের জন্ম দিতে সফল হয়েছিল।

​ইতিহাসবিদ সব্যসাচী ভট্টাচার্য তাঁর বিখ্যাত গবেষণামূলক গ্রন্থ, 'Vande Mataram : The Biography of a Song'-এ আর্কাইভের বিভিন্ন নথি ঘেঁটে ধূর্ত ব্রিটিশদের তৈরি করা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির গভীর বিশ্লেষণ করেছেন।

এই আলোচনা থেকে বিষয়টি খুবই স্পষ্ট যে, ব্রিটিশদের উসকে দেওয়া রাজনৈতিক অভিসন্ধিকে দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা মুসলমানরা ধর্মীয় কারণের মোড়কে 'বন্দে মাতরম' গানের প্রথম দুটি স্তবক ছাড়া অন্য অংশের বিরোধিতা করেছিলেন। আর রবীন্দ্রনাথ সেই ফাঁদে পা দিয়েছিলেন, কিংবা তাৎক্ষণিকতার প্রয়োজনে মুসলমানদের ধর্মীয় আবেগকে, যা বস্তুত এক রাজনৈতিক এজেন্ডার ছদ্মরূপ, মান্যতা দিয়েছিলেন।

​অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে খিলাফতকে যুক্ত করে গান্ধীজী যে ভুল করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ সেই ভুলকে তাঁর অজ্ঞাতসারে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি এই অত্যন্ত কুটিল ও পরিকল্পিত মুসলিম-ব্রিটিশ ভারত-বিভাজনের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রকে বিচার করেছিলেন একজন কবির সহজ, মানবিক ও আদর্শবাদী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে।

​আর যদি ধরেও নিই, গানটির অন্তর্নিহিত সত্যের নিরিখে নিরাকার ব্রহ্ম ও সেমেটিক ধর্মের কথা মাথায় রেখে তিনি এই পরামর্শ দিয়েছিলেন, তাহলেও একটি প্রশ্ন থেকে যায়। রবীন্দ্রনাথ কি ভুলে গেছিলেন, উপনিষদের বিমূর্ততা বা গীতার অবিনাশী আত্মতত্ত্ব নয়, (যা স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছিল অগ্নিযুগের শিক্ষিত হিন্দু তরুণদের) পুরাণ-মহাকাব্যগুলি ছিল ভারতবর্ষের আপামর সাধারণ মানুষের অনুসরণীয়। প্রতীক বা বিমূর্ততা নয়, তারা চায় মূর্তি। বঙ্কিম তাদের সেই আয়ুধ দান করেছিলেন বন্দে মাতরম গানে। উদ্দেশ্য মহৎ থাকলেও, আমার ধারণায়, রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব এবং মানুষের ভিতর পুরাণের প্রভাব সম্পর্কে অনবধানতা তাঁর এই ঐতিহাসিক ভুলের কারণ। ফল হয়েছিল, পরোক্ষভাবে দ্বিজাতিতত্ত্ব মান্যতা পেয়ে গেছিল। জয়যুক্ত হয়েছিল ব্রিটিশ কৌশল এবং বিভেদকামীদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা।

​আর কংগ্রেসের বড়ো ক্ষতি হয়েছিল আদর্শগত স্তরে। গানটি খণ্ডিত করার মাধ্যমে তারা অজান্তেই যেন স্বীকার করে নিয়েছিল যেন ভারতের সুপ্রাচীন মাতৃবন্দনার ঐতিহ্যের মধ্যে সত্যিই এমন কিছু আছে যা 'আপত্তিকর' বা অন্য ধর্মের পরিপন্থী। এর ফলে মুসলিম লিগ বা জিন্নাহর ন্যারেটিভ পরোক্ষভাবে মান্যতা পেয়ে যায় যে, হিন্দুদের সাংস্কৃতিক প্রতীক এবং মুসলিমদের বিশ্বাস একটি অখণ্ড রাষ্ট্রে সহাবস্থান করতে পারে গঠন। অর্থাৎ কংগ্রেসের এই আপোস শেষাবধি হিন্দু-মুসলমান ঐক্য তো রক্ষা করতে পারলই না, উলটে মুসলিম লিগ কংগ্রেসের এই আপোসকে দুর্বলতা হিসেবে দেখেছিল। এবং এর সুযোগ নিয়ে মুসলিম লিগ এবং জিন্নাহ ১৯৩৮ সালের 'পীরপুর রিপোর্ট'-এ এই গানকে অন্যতম হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করে দ্বিজাতিতত্ত্বের সমর্থকদের পায়ের তলার মাটি শক্ত করেছিল। ইতিহাস সাক্ষী দেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে আপোস বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কখনোই থামাতে পারে না।

​এই লেখক মনে করে, তৎকালীন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক চিন্তকদের সবচেয়ে বড়ো ভুল ছিল এই বিস্মরণ যে, ভারতবর্ষের প্রকৃত পরিচয় তার ভৌগোলিক মানচিত্র বা রাজনৈতিক কাঠামো নয়। সে এক নিরবচ্ছিন্ন সভ্যতা, বহু আক্রবীন্দ্রনাথ ও নিরাময়

​রবীন্দ্রভক্ত যে-লেখক তার প্রিয় ও মহান কবিকে আতস কাচের নীচে রাখতে পিছ-পা হয়নি, সে-ই মনে করে রবীন্দ্রনাথেই আছে এর নিরাময় ও সমাধান। ভারতবর্ষের অঙ্গুলিমেয় যে ক-জন মানুষ ভারত-আত্মাকে সঠিকভাবে বুঝেছিলেন রবীন্দ্রনাথ সেইসব অগ্রগণ্যদের অন্যতম। তিনিই তো লিখেছিলেন, 'একের অনলে বহুরে আহুতি দিয়া / বিভেদ ভুলিল জাগায়ে তুলিল একটি বিরাট হিয়া।' অর্থাৎ এই সভ্যতা এমন এক একত্বের সাধনা করে এসেছে, যে-একত্ব নিজেকে বহুরূপে, বিচিত্রতায় প্রকাশ করেছে; এবং সেই বহুত্বকে তার অল-ইনক্লুসিভ স্বরূপে মিশিয়ে নিয়েছে। এখানে বৈচিত্র্য আছে, বিরোধ নেই। এই হল ভারত-আত্মা। সে জানে সেই এক বহুকে নিয়েই, কিন্তু বহুর সমষ্টি একত্ব নয়। সমষ্টিতে জোড়া-লাগানোর দাগ থাকে, আর সেই দাগ যে-কোনো সময় প্রকট হতে পারে। ভারত আগে সভ্যতামূলক রাষ্ট্র, পরে সাংবিধানিক রাষ্ট্র। এই সমন্বয়ের বা প্রায়োরিটাইজেশনের অভাবে ভারতরাষ্ট্র হয়ে ওঠেনি 'একটি বিরাট হিয়া'। স্থাপিত হয়নি হিন্দু-মুসলমান ঐক্য, ধর্মের নামে থেকে গেছে দুটি জাতি। তার কারণও ঐতিহাসিক। হিন্দু-মনস্তত্ত্বের (psyche) গভীরে তথা অবচেতন থেকে গেছে প্রায় শুশ্রূষাহীন মোপলা গণহত্যা, দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং, নোয়াখালি দাঙ্গার ট্রমা। তারও আগে মুসলিম আমলের ধর্মান্তরকরণ, হিন্দু-মন্দির ধ্বংস, ধর্ষণ ইত্যাদি মধ্যযুগীয় বর্বরতা।

​কিন্তু এসবের জন্য বর্তমান মুসলিম সম্প্রদায়কে আদৌ দোষী সাব্যস্ত করা চলে না। এঁরা তুর্কি, মোগল, আরব বা পাঠান নন। সুফিদের প্রভাবে এবং সামাজিক কারণে কিছু মানুষ স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করলেও এঁদের পূর্বপুরুষের সিংহভাগ বাধ্যতামূলক ধর্মান্তরের অসহায় শিকার। রাজনৈতিক ও ধর্মব্যবসায়ীরা এই সত্য থেকে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে দূরে রাখতে সচেষ্ট হয়েছে তাদের নিজস্ব মগজধোলাই-করা শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। মুসলিম ভাইবোনেরা যত দ্রুত তাদের ডি.এন.এ-র সত্য অনুধাবন করবে, তত দ্রুত এক সার্বিক ভ্রাতৃত্ববোধের উন্মেষ ঘটবে বলে আমার বিশ্বাস। তখন ভিন্ন ভিন্ন পোশাকের অন্তরালে আমরা আবিষ্কার করব আমাদের একই সত্তাকে। তাঁদের আদর্শ হয়ে উঠুন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, মওলানা আবুল কালাম আজাদ ও ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ড. এ. পি. জে. আবদুল কালাম। আর হিন্দুদের আদর্শ হয়ে উঠুন স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রী অরবিন্দ, রবীন্দ্রনাথ ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে সত্য প্রতিষ্ঠার এই-ই প্রকৃষ্ট সময়। সমস্বরে উচ্চারিত হোক দেশমাতৃকার স্তব। বিনাশপ্রাপ্ত হোক সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরুত্বের সাম্প্রদায়িক চাতুরী। ধর্মনিরপেক্ষতার ভণ্ডামিও। 'বিরাট হিয়া' জাগিয়ে তুলবার যজ্ঞে সকলের জন্য ধ্বনিত হোক সাদর আহ্বান। জাতিধর্মনির্বিশেষে আমরা হয়ে উঠি সনাতন সভ্যতার একজাতি একপ্রাণ গর্বিত ভারতবাসী। এভাবেই তৈরি হতে পারে 'মঙ্গলঘট', ত্বরান্বিত হতে পারে 'মায়ের অভিষেক'।

রমণ, বহু বছরের পরাধীনতা এবং রাজনৈতিক পালাবদলের পরও আজও যে এক জীবন্ত সত্তা।

​এর গোপন এজেন্ডায়?

ঐশী ঘোষণা।

প্রতীক।

স্কৃতিক

হান সাং

গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা এখানে প্রকাশিত লেখক, অতিথি ও অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য ও মতামত একান্তই তাঁদের নিজস্ব। এসব বক্তব্য বা মতামত Poorvam-এর নীতি, অবস্থান বা মতামতকে প্রতিফলিত করে না।
স্বত্ব ও লাইসেন্স: এই রচনাটি Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International (CC BY-NC-ND 4.0) লাইসেন্সের আওতায় প্রকাশিত। মূল লেখকের নাম ও ‘আনুপূর্বী’ পত্রিকার সূত্র উল্লেখ সাপেক্ষে অবাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত।
creative commons

আমরা তথ্যের অবাধ মুক্ত প্রবাহে বিশ্বাসী

ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে আমাদের লেখা বিনামূল্যে অনলাইনে বা প্রিন্টে পুনঃপ্রকাশ করুন।

Sudhir Dutta
লেখক পরিচিতি
পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল ও রচনাবলি →

Sudhir Dutta

বাংলা ভাষার গুরুত্বপূর্ণ একজন কবি। কবিত্বের ঐশী শক্তিতে বিশ্বাস করেন। তাঁবু মই ও শ্রেষ্ঠ কবিতাগুচ্ছ’ গ্রন্থের জন্য ১৪২২ সনের আনন্দ পুরস্কারে সম্মানিত।

আরও পড়ুন