১৯৯২ সাল। ৬ ডিসেম্বর। পুরোনো রাম মন্দিরের ভগ্নপ্রায় ঢাঁচা ভাঙ্গা পড়ল। বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ হিন্দু গণহত্যা, গণধর্ষণ, লুঠতরাজের শিকার হলেন। লক্ষ লক্ষ হিন্দু কাঁটাতার, নদী, নালা পেরিয়ে এপার বাংলায় এসে উঠলেন। ১০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ নিষিদ্ধ ঘোষিত হল।
আমার বাবা অজ্ঞাতবাসে। সঙ্ঘের প্রচারকরা অজ্ঞাতবাসে। কখনও কখনও নিশুতি রাতে ১১টা-সাড়ে ১১টার গভীর অন্ধকারে জানলায় টোকা পড়ে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের সঙ্গে মিশে ফিসফিসে গলায় ডাক আসে ‘বৌদি, দরজাটা খুলুন। আমি অমুক।’ বিদ্যুতের আলো না জ্বেলে মোমবাতি জ্বেলে সন্তর্পণে গেটের তালা খুলে চুপিসাড়ে ঢোকানো হয় নিশীথের অতিথিকে। এই অবস্থা দীর্ঘদিন চলেছে। প্রায় ৬ মাস। বাবা অবশ্য বাড়ি ফিরেছিলেন মাসখানেকের মধ্যেই।
এর আগে ১৯৯০-তে বাংলাদেশের ‘দৈনিক ইনকিলাব’ পত্রিকায় বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা হয়েছে এইরকম একটি ভুল সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে প্রবল হিন্দু বিরোধী দাঙ্গা শুরু হয়। ৩০ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র তিন দিনের এই দাঙ্গায় বহু মানুষ হতাহত হন; ধর্ষিতা হন অজস্র মহিলা; মঠ মন্দির, ঘরবাড়ি, দোকানপাট ভাঙ্গচুর ও লুঠপাট হয় অসংখ্য। এর পরে ১৯৯২ সালে শুরু হল প্রবল হিন্দু বিরোধী সন্ত্রাস। ভয়াবহতায় এই সংগঠিত সন্ত্রাস বিশ্বের প্রথম দশটির মধ্যে স্থান পেতেই পারে। সিলেটে চৈতন্যেদেবের পূর্বপুরুষদের ভিটাবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। চারশ বৎসর প্রাচীন একটি গ্রন্থাগার ছিল সেখানে। সেটিও ভস্মসাৎ করা হয়। ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরে অগ্নিসংযোগ হয়। পোড়া ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় ঐতিহাসিক ঢাকেশ্বরী মন্দির। চট্টগ্রামে সাতশ বাড়ি ভস্মীভূত। ভোলা জেলায় হিন্দু এলাকাগুলি ধ্বংসস্তূপ। দশ হাজারের অধিক পরিবার গৃহহীন হয়ে মাঘের শীতে খোলা আকাশের নীচে বসে আছে। সারা দেশে বীভৎস বর্বরতা ও সহস্র নির্যাতিতের হাহাকার, ক্রন্দন। লক্ষ লক্ষ মানুষ সর্বস্বান্ত।
তসলিমা নাসরিন সেই সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসিকা। প্রতিদিন হাসপাতালে আক্রান্ত হিন্দু মানুষ আসতে থাকেন। তসলিমা তাদের চিকিৎসা করেন। দিনে দিনে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে এর ভয়াবহতা। চিকিৎসা করার পাশাপাশি তিনি আহত, ধর্ষিত মানুষগুলির সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতা সারেন। পুরোনো ঢাকার অলিগলি থেকে ‘একতা’, ‘সংবাদ’, ‘আজকের কাগজ’, ‘ভোরের কাগজ’ প্রভৃতি পত্রিকার পুরোনো সংখ্যা খুঁজে বের করেন। এই পত্রিকাগুলিতে এই ভয়াবহ দাঙ্গার বিবরণ প্রামাণ্য ভাবে উপস্থাপিত হয়েছিল। হিন্দুদের উপর প্রবল অত্যাচারের বিবরণ ছাপা হয়েছিল। তসলিমা এই বিবরণ ও নিজের অভিজ্ঞতার আধারে লিখতে শুরু করেন উপন্যাস ‘লজ্জা’। অপারেশন থিয়েটারে সার্জেন যখন রুগির অপারেশন করেন তখন তসলিমা নিজের পকেট থেকে কাগজ কলম বের করে সেই রুগির পাশে বসে লিখতে থাকেন ‘লজ্জা’– সুরঞ্জন দত্তের কাহিনী। সুরঞ্জন দত্ত ঢাকার কোন এক মহল্লায় থাকে। সে ধর্ম মানে না। সে নাস্তিক, সে কমিউনিস্ট। অথচ সেই সুরঞ্জনের জীবন ইসলামিক মৌলবাদের আক্রমণে কীভাবে বদলে গেল সেই কাহিনীকে উপজীব্য করে “খুব অল্প কথায়, অল্প বর্ণনায় মূলত তথ্য দিয়ে হিন্দুদের অবস্থার বর্ণনা করে লেখা এটিকে না বলা যায় গল্প, না বলা যায় উপন্যাস।” (দ্বিখণ্ডিত)
১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকার পার্ল পাবলিশার্স থেকে সেই বই প্রকাশ পেল। সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত উৎকৃষ্ট নয়। উপন্যাস না বলে তথ্যমূলক প্রতিবেদন বললেই ভাল হয়। কেবল সুরঞ্জন, তার বোন মায়ার মত কয়েকটি কাল্পনিক চরিত্র, পারিপার্শ্বিকের প্রভাবে সুরঞ্জনের মানসিক বিবর্তন ব্যতীত উপন্যাসের কোনো উপাদান এতে নেই বললেই চলে। নিজের আত্মজীবনী মূলক তৃতীয় উপন্যাস ‘দ্বিখণ্ডিত’তে লেখিকা ‘লজ্জা’ উপন্যাস সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, “বইটির গদ্য ভাল নয়, বইটি উপন্যাস হয়নি, তথ্যে ঠাসা বইটি বার বারই মনোযোগ নষ্ট করে,… বইটিতে ত্রুটি আছে অবশ্যই। অল্প সময়ের মধ্যে লেখা। প্রকাশকের চাপে বইয়ের গুণগত মানগত ব্যাপারগুলো নিয়ে ভাবার জন্য মোটেও সময় পাইনি।” বইটি প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৯৩-এর বাংলাদেশের অমর একুশে বইমেলায় কয়েকদিনের মধ্যেই প্রথম সংস্করণ সমাপ্ত হয় এবং দ্বিতীয় সংস্করণও প্রায় শেষের মুখে। এমতাবস্থায় বইমেলার মধ্যেই তসলিমা নাসরিনের উপর প্রাণঘাতী হামলা হয়। কোনক্রমে কয়েকজন বন্ধু ও প্রকাশকের তৎপরতায় তাঁর প্রাণ রক্ষা হলেও তাঁর বইমেলায় প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়। এর কিছুদিন পরে ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিঘ্নিত করছে’ এই অপবাদে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ১১ জুলাই ১৯৯৩ বইটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হল। এর পরে তসলিমাকে বাংলাদেশ সরকার নির্বাসন দণ্ড দেয়। তসলিমা বাংলাদেশ ছাড়েন।
এদিকে এপার বাংলাতেও তখন ‘লজ্জা’ প্রায় বেস্টসেলারের পর্যায়ে। আনন্দ পাবলিশার্সের সঙ্গে লেখিকার চুক্তি হয় এবং পুরোনো লেখাটির খোলনলচে পাল্টে নতুন রূপে নভেম্বর মাসে উপন্যাসটির প্রথম ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। কিন্তু তার আগেই কলকাতা বইপাড়ার কয়েকজন প্রকাশক নিজেদের জীবন ও জীবিকার ঝুঁকি নিয়ে ‘লজ্জা’ ছাপিয়েছিলেন। সেই কথায় পরে আবার আসব।
এর পরে তসলিমার লেখা ‘আমার মেয়েবেলা’ (১৯৯৯), ‘উতল হাওয়া’ (২০০০), ‘ক’ (২০০৩) বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হয়। এরই মধ্যে ২০০৩ সালে তসলিমার আত্মজীবনী মূলক উপন্যাসের চতুর্থ খণ্ড ‘দ্বিখণ্ডিত’ প্রকাশিত হয় (প্রথম খণ্ড ‘আমার মেয়েবেলা’, দ্বিতীয় খণ্ড ‘উতল হাওয়া’, তৃতীয় খণ্ড ‘ক’)। পশ্চিমবঙ্গে তখন ‘মার্ক্সবাদ সত্য, কারণ ইহা বিজ্ঞান’ মার্কা প্রগতিশীল বাম সরকার ক্ষমতার মধ্য গগনে। সিপিএম-এর নেতাদের কথাই আইন। তাদের নির্দেশেই আকাশে সূর্য-চন্দ্র উদিত হয়, অস্তমিত হয়। সেই প্রগতিশীল, বাক্ স্বাধীনতার ওকালতি করা, সর্বহারার কথা বলা, নারী স্বাধীনতার কথা বলা বাম সরকার ‘দ্বিখণ্ডিত’ উপন্যাসটি নিষিদ্ধ করল। যে দল ‘ধর্ম’-কে আফিম বলে প্রচার করে সেই দলের সরকার ‘ধর্মানুভূতি আহত হবে’ এই কারণ দেখিয়ে একটি ফেমিনিস্ট বইকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করল।
মজার ব্যাপার হল, সেই সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তখনও নন্দীগ্রামের সূর্যোদয় হয়নি। জনমানসে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য একজন সেলিব্রিটি কবি এবং আপাদমস্তক সৎ ও ভদ্রলোক বলে পরিচিত। তিনি বললেন যে বইটি তিনি পড়েছেন। এবং তার পরে কলকাতা খিলাফত কমিটির আবেদনে সাড়া দিয়ে বইটি নিষিদ্ধ করলেন। পিপলস বুক সোসাইটির অফিস ও গুদাম থেকে ২৫০০ কপি বই বাজেয়াপ্ত হল। পাণ্ডুলিপির কপি বাজেয়াপ্ত হল। প্রায় দুই বৎসর কলকাতা হাইকোর্টে মামলা চলল। এবং তারপর ‘দ্বিখণ্ডিত’ ছাড়পত্র পেল।
২০০৪ সাল থেকে তসলিমা কলকাতাতেই ছিলেন। ২০০৬ সালে কলকাতা টিপু সুলতান মসজিদের ইমাম সৈয়দ মহম্মদ নূর উর রহমান বরকতি, যিনি নিজেকে কলকাতার শাহী ইমাম বলে দাবি করতেন, একটি ফতোয়া জারি করেন। সেখানে বলা হয়, যে ব্যক্তি তসলিমার মুখে কালি লেপতে পারবে বা তার চামড়া তুলে নিতে পারবে তাকে পুরস্কৃত করা হবে। বলা বাহুল্য, ‘কবি বুদ্ধিজীবী সৎ ভদ্রলোক’ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন প্রগতিশীল বাম সরকার এই ফতোয়ার ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করল না। অল ইণ্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড ২০০৭-এর মার্চ মাসে তসলিমাকে হত্যা করার জন্য নগদ পাঁচ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে ফতোয়া জারি করল। ৯ আগস্ট ২০০৭ হায়দ্রাবাদে একটি বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে গেলে AIMIM-এর বিধায়কের প্ররোচনায় তসলিমার উপর প্রাণঘাতী হামলা হল। ১৭ই আগস্ট কলকাতার ‘প্রগতিশীল’ মুসলিমরা তসলিমাকে হত্যা করার জন্য বিপুল অর্থ পুরস্কার ঘোষণা করল।
এই সমস্ত কিছুর মধ্যে একটি বাংলা পত্রিকায় ‘দ্বিখণ্ডিত’ উপন্যাসের কিছু উদ্ধৃতি ছাপা হল। ২১ নভেম্বর ২০০৭ ‘অল ইণ্ডিয়া মাইনরিটি ফোরাম’ নামক জঙ্গীগোষ্ঠীর নেতৃত্বে কলকাতায় প্রতিবাদের নামে শুরু হল সন্ত্রাস। সেই সন্ত্রাস মোকাবিলায় পার্ক সার্কাস ও মৌলালিতে সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করতে বাধ্য হল সরকার। ভারত সরকার কলকাতা থেকে তসলিমাকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন জয়পুর হয়ে দিল্লী। দীর্ঘ প্রায় চার মাস তাকে অজ্ঞাতবাসে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। ১৯ মার্চ ২০০৮ তিনি ভারত ছাড়তে বাধ্য হলেন। বলা বাহুল্য, পশ্চিমবঙ্গে তখনও প্রগতিশীল বাম সরকার। এবং কেন্দ্রে তখন বামফ্রণ্ট সমর্থিত ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ এলায়েন্সের নেতৃত্বাধীন সরকার।
এরপর কালের চাকা ঘুরেছে। ২০১১-তে ‘নন্দীগ্রামে সূর্যোদয়’ সহ নানা ঘটনার অভিঘাতে পশ্চিমবঙ্গে বাম সরকারের সূর্য অস্তমিত হল। নতুন ভোরের নতুন আশা নিয়ে ক্ষমতায় আসীন হলেন বঙ্গললনা তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সহায় হলেন তথাকথিত ‘সুশীল সমাজ’। সেই সুশীল সমাজ যারা তসলিমার বিরুদ্ধে ফতোয়ার প্রতিবাদ করার জন্য প্রয়োজনীয় সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারেননি কোনদিন। সেই সুশীল সমাজের নেতৃত্বে ছিলেন অপর্ণা সেন, জয় গোস্বামী, ব্রাত্য বসু, শুভাপ্রসন্নরা।
তসলিমার মত দীর্ঘদিনের বঞ্চিতরা এই পালাবদলে বোধহয় আশাবাদী হয়েছিলেন। এই বুঝি গণতন্ত্র, বাক্ স্বাধীনতা, সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হল। হাজার হোক, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তো যথার্থ বামপন্থী।
এবং সময় প্রমাণও করল যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই যথার্থ বামপন্থী। এতদিন যে সমস্ত বুদ্ধিজীবীরা বাক্ স্বাধীনতা, গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করেছিলেন তারাই মক্ষীরানীর চারপাশে জড়ো হলেন।
২০১২তে তসলিমার আত্মজীবনী মূলক উপন্যাস সমূহের একটি ‘নির্বাসন’ প্রকাশের অনুষ্ঠানের বিরোধিতায় পথে নামল ‘মিল্লি ইত্তেহাদ পরিষদ্’। মমতা ও ক্ষমতার বৃত্তে থাকা বুদ্ধিজীবীরা নীরব রইলেন।
তসলিমার উপন্যাস ‘দুঃসহবাস’-কে উপজীব্য করে সুশান্ত বসুর পরিচালনায় মেগা সিরিয়ালের নির্মাণ শুরু হল। অশোক সুরানার প্রয়োজনায় নির্মিত ধারাবাহিকের সম্প্রচার শুরু হওয়ার কথা ছিল আকাশ ৮ চ্যানেলে ১৯ ডিসেম্বর ২০১৩ থেকে। চ্যানেলে ২১ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখে একটি ঘোষণায় জানানো হয় যে, “একটি নির্দিষ্ট কারণে অনির্দিষ্টকালের জন্য দুঃসহবাসের সম্প্রচার বন্ধ রাখা হল।” ‘নির্দিষ্ট কারণ’টি হল ‘মিল্লি ইত্তেহাদ পরিষদ্’-এর হিংস্র প্রতিবাদ আন্দোলন ও তার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের অলিখিত নির্দেশ। সারা শহর জুড়ে ‘দুঃসহবাস’-এর প্রচারের হোর্ডিং খুলে ফেলা হল রাতারাতি।
২০১৪-তে দিল্লীর একটি বাঙ্গালি নাট্য সংস্থা নবপল্লী একটি নাটক প্রযোজনা করল। তসলিমার রচিত ‘লজ্জা’ অবলম্বনে নাটকটি রচনা করেন বিশ্বজিৎ সিনহা। দিল্লীতে তিনবার নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। ২০১৪-র ডিসেম্বরে পাণ্ডুয়ার ডায়মণ্ড ক্লাবের নাট্য উৎসবে এই নাটকটি মঞ্চস্থ হওয়ার কথা ছিল। চার মাস আগে থেকে নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, জেলাশাসক ও স্থানীয় প্রশাসনের চাপের মুখে পড়ে নাটকটির মঞ্চায়ন তারা বাতিল করছেন। জানুয়ারি ২০২৫। এই একই নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার কথা গোবরডাঙ্গায়। আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। ঘটনাচক্রে পশ্চিমবঙ্গের থিয়েটার জগতের মুকুটহীন সম্রাট ব্রাত্য বসু তখন মন্ত্রী। শাঁওলী মিত্র, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তরাও ক্ষমতার বৃত্তে। ঘচনাচক্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্নেহধন্য কবি জয় গোস্বামী তখন নজরুল একাডেমির চেয়ারম্যান। সেই দিন নাট্য শাঁওলি মিত্র, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, ব্রাত্য বসু, অপর্ণা সেন থেকে শুরু করে মহাবিপ্লবী সৌরভ পালোধির মত ব্যক্তিত্বরা নাটকের স্বাধীনতা, বাক্ স্বাধীনতা নিয়ে মুখ খোলেননি।
ইতিমধ্যে গঙ্গার অববাহিকা দিয়ে অনেকটা জল বয়ে গিয়েছে। আবার একবার রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে। দীর্ঘ ১৯ বৎসরের নির্বাসন শেষে তসলিমা নাসরিন কলকাতায় এসেছেন ওসমান গনি, মোহিত রায়, শান্তনু সিনহাদের আমন্ত্রণে। আবেগের উচ্ছ্বাসে ভেসেছেন। এতদিনে হয়ত তিনি উপলব্ধি করেছেন যে, ‘হিন্দু মৌলবাদ’, ‘গৈরিক সন্ত্রাসবাদ’ প্রভৃতি ছেলেভোলানো রূপকথার কোন সত্যতা নেই। লাল-পেড়ে সাদা শাড়ির প্রতীকে হয়ত সেই চিরন্তন হিন্দু সংস্কৃতিকেই বরণ করার মৌন বার্তা দিতে চেয়েছেন।
এই সমস্ত পুরোনো গল্প অনেকে জানেন। আবার যারা ১৯ বৎসর পরে তসলিমার কলকাতায় পদার্পণে উচ্ছ্বসিত হয়ে তসলিমা নাসরিনকে দেখতে গিয়েছেন তাদের অনেকে হয়ত বা জানেনও না। কিন্তু, এই সমস্ত গল্পকথার নীচে চাপা পড়া একটা না বলা গল্প থেকে গিয়েছে। আমার লেখা সেই না বলা গল্প নিয়ে। এটি গল্পই। কারণ এই সত্যতা প্রমাণ করার কোন দায় আমার নেই। এই গল্প বিশ্বাস করা বা না করা পাঠকের ইচ্ছাধীন।
‘লজ্জা’ যখন বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হয়েছে তখন কলকাতাতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি না হলেও দোর্দণ্ডপ্রতাপ সাম্যবাদী দলের নীরব চোখ রাঙানিতে ‘লজ্জা’র বিক্রয় বন্ধ ছিল। সেই সময়ে কলকাতা বইপাড়ার কয়েকজন দুঃসাহসী প্রকাশক ‘লজ্জা’ ছেপেছেন। সেই ‘লজ্জা’ ঢাকতে বইয়ের উপরে ‘রামের সুমতি’ কিংবা ‘বিষবৃক্ষ’-এর মলাট চাপানো হয়েছে। একই ঘটনা ‘দ্বিখণ্ডিত’ নিষিদ্ধ হওয়ার সময়েও হয়েছে। সেই সময়ে– বিশেষ করে ‘লজ্জা’ প্রকরণে– আমি নেহাতই শৈশব পেরিয়ে কৈশোরের দিকে এগোচ্ছি। আমার মত ছু শৈশব থেকে কৈশোরে এগোনো বা কৈশোরে পড়া ছেলে অমুকদাদা কিংবা তমুককাকুর সঙ্গে বইপাড়া থেকে স্কুলের ব্যাগে করে নিষিদ্ধ বইয়ের ২০-২৫ টি কপি নিয়ে এসেছে। পরের দিন সেই কপি স্থানীয় মানুষদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন সেই সমস্ত দাদা বা কাকুরা। কাকু, দাদারা জানতেন যে রাস্তায় পুলিশ বাচ্চাদের স্কুলের ব্যাগ খানাতল্লাশি করে দেখবে না।
তসলিমার এই ঘটনা জানার কথা নয়। তসলিমা বাক্ স্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল করেছেন। তাঁর মনে হয়েছে কবি জয় গোস্বামীর বাক্ স্বাধীনতা ও সম্মান অত্যন্ত মূল্যবান। যারা জয় গোস্বামীকে তাঁর সামনে অপমানিত করেছে তারা বাক্ স্বাধীনতার বিরোধিতা করল।
একটু ভেবে দেখলে তসলিমা হয়ত উপলব্ধি করতে পারতেন যে, শৈশব থেকে কৈশোরে পা রাখা যে ছেলেটি নিজের পিঠে তার বইয়ের বোঝা বয়ে নিয়ে গিয়েছিল কলকাতা থেকে মফস্বলে; সেই যে দুঃসাহসী বইপাড়ার প্রকাশক যারা ‘লজ্জা’ ঢেকেছিল ‘বিষবৃক্ষ’ বা ‘রামের সুমতি’-তে; সেই দাদা বা কাকুরা যারা পাঠকের হাতে পৌঁছে দিয়েছিল নিষিদ্ধ সাহিত্যের সম্ভার– বাক্ স্বাধীনতার লড়াইতে তারা তসলিমার হাতে হাত রেখে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শামিল হয়েছিল। তারা কেউ জয় গোস্বামীর মত নামকরা কবি নয়। তারা ‘বেণীমাধব’ বা ‘সাঁঝবাতির রূপকথারা’ লিখতে পারে না। তারা সরকারের সুনজরে থেকে নজরুল একাডেমির চেয়ারম্যান হওয়ার কথা কোনদিন ভাবেনি। তাদের কোরোনার চিকিৎসার ব্যয়ভার রাজ্য সরকার বহন করেনি। এবং তারা কোনদিন মুক্ত মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘ক্যা ক্যা ছি ছি’-র মত অমর মহাকাব্য রচনা করার কথাও ভাবেনি। কিন্তু তারা তসলিমার বাক্ স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছে। নীরবে অথচ সক্রিয় ভাবে দাঁড়িয়েছে। তসলিমাকে সাহিত্যিক ও কবির মর্যাদা জয় গোস্বামীরা দেননি। দিয়েছেন সেই মানুষগুলি যারা সেইদিন শান্তিপূর্ণ ভাবে কোন ফতোয়া জারি না করে জয় গোস্বামীর চোখে চোখ রেখে তাকে ‘চটিচাটা’ বলে মঞ্চ থেকে নেমে যেতে বাধ্য করেছে। এই সহজ ও স্বাভাবিক প্রতিবাদকে তসলিমা হয়ত প্রগতিশীলতার পরিপন্থী ভেবেছেন। তিনি এই প্রতিবাদকে ভিন্ন মতের কণ্ঠরোধ ভেবেছেন। কিন্তু তিনি ভেবে দেখেননি যে, যারা সেইদিন তসলিমার কবিতা শুনতে এসেছিলেন তারা তসলিমাকে ভিন্ন মতের জেনেও এসেছিলেন। তারা তসলিমার কণ্ঠরোধ করেননি, তাকে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছেন। জয় গোস্বামীর কণ্ঠরোধ তার ভিন্ন মতের জন্য হয়নি। জয় গোস্বামীর কণ্ঠরোধ হয়েছে তার মেরুদণ্ডহীনতার জন্য।
তসলিমা জয় গোস্বামীর বাক্ স্বাধীনতার কথা ভেবেছেন। তসলিমার কাছে আমার প্রশ্ন খুব সহজ। এই বিপুল সংখ্যক মানুষ যারা অত্যন্ত সহজ সরল ভাষায় প্রশ্ন তুলতে পেরেছেন ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়’ তারা প্রগতিশীল; নাকি যিনি ‘ক্যা ক্যা ছি ছি’ গানে গলা মিলিয়েছিলেন তিনি প্রগতিশীল?