বৌদ্ধ মন্ত্রনয় ধারা: মহাযান-বজ্রযানের উৎপত্তি এবং ক্রমবিকাশ
পর্ব ৫
পিটক অধ্যয়ন-প্রসঙ্গ
বৌদ্ধ মন্ত্রনয়ের এমন বহু অনুসন্ধিৎসু আছেন যাঁরা থেরবাদী ত্রিপিটক পড়তে চান না, বজ্রযানের দেবদেবী নিয়েই তাঁদের আগ্রহ কেবল। কিন্তু নস্যাৎ করার কোনো সুযোগ নেই, স্থবির নিকায়ই বুদ্ধপ্রবর্তিত আদি নিকায়, মহাযান এবং বজ্রযান তা নয়। প্রথমে স্থবির নিকায়, দ্বিতীয়ে মহাযান, তারপর বজ্রযান— এই ক্রম বৌদ্ধ মন্ত্রনয় নিজেই স্বীকার করে। সন্ধিনির্মোচন সূত্র বলে, বারাণসীর ঋষিপতনের মৃগদাবে বুদ্ধ যে ধর্মচক্র প্রবর্তন করেছিলেন তাতে শ্রাবকযানের চার আর্য্যসত্যের শিক্ষার উত্থান হয়েছিল।[1] পরবর্তীকালে রাজগৃহে গৃধ্রকূট পর্বতে বুদ্ধ দ্বিতীয়বার ধর্মচক্র ঘুরিয়েছিলেন মধ্যমক শূন্যবাদ ও প্রজ্ঞাপারমিতা শাস্ত্র স্থাপনের জন্য। তৃতীয়বার বৈশালীতে ধর্মচক্র ঘুরেছিল, তাতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল যোগাচার-বিজ্ঞানবাদ। অর্থাৎ বৌদ্ধ মন্ত্রনয়ের বিকাশ হয়েছিল ধাপে ধাপে।
বৌদ্ধ মন্ত্রনয়ে অনুসন্ধিৎসাকে দুই ভাগ করা যায়। একটি, সাধারণ অনুসন্ধিৎসা, যা মন্ত্রতন্ত্রের বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে জন্মায়। অন্যটি গভীর। কালচক্রের পদতলে কাম ও মহেশ্বর থাকেন, এর আপাত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, কাম অবিদ্যার প্রতীক এবং মহেশ্বর অহঙ্কারের। কিন্তু কালচক্র মঞ্জুশ্রীর বিগ্রহ, এবং মঞ্জুশ্রীর কুমারতত্ত্ব বর্তমান, এই দুই কথা যে জানে সে ঠিক বুঝবে— মহেশ্বর আর কামকে কালচক্র পদদলিত করছেন, এ একমাত্র অর্থ নয়। শিব আর কামের যৌথ সত্তা হিসেবে কালচক্রেশ্বর ভৈরবরূপে কুমার প্রকট হচ্ছেন। তাই শিবের হৃদয়ে কালচক্রের পায়ের বর্ণ শিবের গাত্রবর্ণের সমান, কামের হৃদয়ে কালচক্রের পায়ের বর্ণ কামের গাত্রবর্ণের সমান। কার্ত্তিকেয়র মধ্যেও শিব, কাম দুয়েই বিরাজ করেন। গূঢ় ধর্মের তাৎপর্য বুঝতে গভীর অনুসন্ধিৎসা আবশ্যক।

সশক্তিক কালচক্র। রক্তবর্ণ পদে কাম এবং শ্বেতবর্ণ পদে মহেশ্বর।
স্থবির নিকায় এড়িয়ে মন্ত্রক্রমে ঢুকলে চোখে ধাঁধা লাগার জোগাড় হয়। এত হাজার হাজার বোধিসত্ত্ব কোথা থেকে এল? নাস্তিক বুদ্ধের অনুগামী কী করে কালীর পুজোয় বসে গেল! অথচ বজ্রযানে গোটা কালীতত্ত্ব ধম্মপদের কালী যক্ষিণীর আখ্যানপ্রভাবিত।[2] আমরা ধম্মপদের গাথা পড়ে চলে যাই, আখ্যান পড়ি না। ধম্মপদ, জাতক, অপদানের মতো ক্ষুদ্রপিটকের উপাদানগুলিতেই মন্ত্রক্রমের শিকড় নিহিত। মহাসাঙ্ঘিকদের পৃথক বোধিসত্ত্বপিটকের উৎসও ক্ষুদ্রপাঠের চর্যাপিটক। পালি নিকায় ও সর্বাস্তিবাদী নিকায়ের তুলনামূলক অধ্যয়ন করলে বোঝা যায়, ক্ষুদ্রপাঠের একেকটি গল্প অভিধর্মপিটকের থেকেও বয়সে প্রাচীন ছিল। পালি নিকায়ের বহু বড় ও মাঝারি সূত্র সর্বাস্তিবাদী নিকায়ে অনুপস্থিত, কিন্তু পালি নিকায়ের ধম্মপদের প্রায় সব গাথা তাইশো ক্যাননের ধর্মসংগ্রহগাথায়[3] ও তিব্বতী ক্যাননের উদানবর্গে ঢুকে আছে। পালি নিকায়ের বিমানবত্থু সর্বাস্তিবাদে বিমানাবদান। পালি নিকায়ের ইতিবুত্তক তাইশো ক্যাননে বেনশিজিং।
বুদ্ধের ধর্মে কোন কোন বস্তু পরের সংযোজন আর কোন কোন বস্তু প্রাক্কাল থেকেই ছিল সে গলার জোরে প্রতিষ্ঠা করার নয়। সে বুঝতে একাধিক নিকায়ের পিটক পাশাপাশি রেখে পড়তে হয়। পালি পিটকর অঙ্গুত্তর নিকায়ের সোণ সুত্তে[4] বুদ্ধ ব্রাহ্মণদের কুকুরের অধম বলে যেভাবে নিন্দা করেছেন তা পালি নিকায়েরই অন্যান্য সূত্রের জাতিবাদ দমনের সঙ্গে তুলনা করলে মেলে না। সোণ সুত্তে বুদ্ধের কথায় জাতিবাদ দমনের দায়ের থেকে অন্তরের বিদ্বেষ বেশি ফুটে ওঠে। অথচ এই বুদ্ধই বলেন, অন্তরে বিদ্বেষ নিয়ে সম্যকবোধি লব্ধ হয় না। পড়লে সন্দেহ জাগে, সোণ সুত্ত আদৌ কি বুদ্ধবাক্য? তাইশো বা তিব্বতী ক্যাননে এর সমান্তরাল কোনো সূত্র উদ্ধার করা যায়নি।
আবার দিব্যাবদানের শার্দুলকর্ণ অবদান তথা বৈপুল্য পিটকের মাতঙ্গ সূত্রের[5] গল্প মাতঙ্গ জাতকের[6] থেকে অনুপ্রেরণা নিলেও মাতঙ্গ জাতক আর মাতঙ্গ সূত্রের প্রেক্ষাপট একেবারে ভিন্ন। মাতঙ্গ জাতকের প্রেক্ষাপটে বৎসরাজ উদয়ন-কর্তৃক পিণ্ডোল ভারদ্বাজের নিপীড়িত হবার ঘটনা, অন্যদিকে মাতঙ্গ সূত্রের প্রেক্ষাপটে বুদ্ধ চণ্ডালিনী প্রকৃতিকে প্রব্রজ্যা দেওয়ায় কোশলরাজ প্রসেনজিতের আপত্তি। মাতঙ্গ জাতকে জাতিবাদকে নিগ্রহ করা হয়েছে, কিন্তু ব্রাহ্মণনিন্দাকে মূল লক্ষ্য করে তোলা হয়নি। অন্যদিকে মাতঙ্গ সূত্রে বুদ্ধ যখন প্রসেনজিতকে জাতিবাদের অসারতা বোঝাচ্ছেন, তাঁর গল্পকথনে রীতিমতো ব্রাহ্মণবিদ্বেষ ধরা পড়ে। মাতঙ্গ জাতকে বোধিসত্ত্ব চণ্ডাল কুলে জন্মে যে কন্যাকে বিবাহ করতে উন্মুখ হয়েছিলেন সেই দিট্ঠমঙ্গলিকা শ্রেষ্ঠীর মেয়ে। কিন্তু মাতঙ্গ সূত্রের গল্পে প্রকৃতিকে করা হয়েছে ব্রাহ্মণকন্যা।
এই পরিবর্তন স্পষ্ট বোঝায়, বুদ্ধের উদ্দেশ্য আর বৌদ্ধের উদ্দেশ্যের মধ্যে ধীরে ধীরে কতখানি দূরত্ব বেড়েছিল। শুধু মন্ত্র, তন্ত্র বা দেবতার সংযোজন নয়— সম্যকসম্বুদ্ধ ভগবানের মুখে সরাসরি অন্তর্দৃষ্টিহীনের অশুদ্ধ, অবুদ্ধোচিত বক্তব্য আরোপ করার প্রবণতাও মহাযান এবং স্থবির নিকায় দুই পক্ষেই উৎপন্ন হয়েছিল। পিটক পড়ার সময়ে মনে রাখতে হবে, আমরা যে রীতিতে বুদ্ধবচন পড়ি, বুদ্ধ সে রীতিতে ধর্মদেশনা করতেন না। তাঁর নিজের নিশ্রয়দোষ ছিল না। সন্তানের বিষ ঝাড়ার জন্য সন্তানেরই বিষের খানিক তুলে ওষুধ হিসেবে কাজে লাগাতেন মাত্র। এমন নয় যে হঠাৎ অহেতুক বুদ্ধের সাধ হল, তিনি বলে বসলেন, “শোনো ভিক্ষুরা, আমি এখন তোমাদের অমুক নামের এক সূত্র দিচ্ছি…” এভাবে সূত্র আরম্ভ হয় না। সূত্র আরম্ভ হয় “এবং ময়া শ্রুতম্” বাক্যে, আনন্দর বয়ানে। প্রথমে হেতুর উৎপত্তি, দ্বিতীয়ে বুদ্ধের নিষ্পত্তি, তৃতীয়ে আনন্দর শ্রুতি। তারপর সে সূত্র যখন আনুষ্ঠানিক উদ্যোগে পিটকে ঢোকে, তখন পিটককারদের সৌজন্যে একটি নাম পায়। সোণ সুত্ত উদাহরণ। সুত্র কুকুরের নামে, অথচ তার আলোচ্য বিষয় ব্রাহ্মণসমাজ। বুদ্ধ নিজে সূত্রের নামকরণ করেননি। শাস্ত্র যাদের হাতে পড়ে তারা সকলে বুদ্ধ নয়, আনন্দও নয়। তাই প্রত্যেক সূত্রের হেতুবিচার প্রয়োজন। নিকায়ের পাশাপাশি মহাযানের পিটকের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য।
আমাদের কাছে যে পিটক মারফত বুদ্ধবচন পৌঁছোয় সে পিটক অনেক ভাঙ্গাগড়ার ফল। প্রথম সঙ্গীতিতে সংকলনের পর পিটক কেমন ছিল, প্রত্যক্ষে জানার উপায় নেই। পরে বৌদ্ধ ধর্ম অসংখ্য শাখায় ভেঙ্গেছে, প্রত্যেকের একটি করে পিটক হয়েছে। হিউয়েন সাং ভারত থেকে মোট সাতটি শাখার পিটক নিয়ে গেছিলেন— মহাসাঙ্ঘিক, সর্বাস্তিবাদী, বিভাজ্যবাদী, সম্মিতীয়, কাশ্যপীয়, ধর্মগুপ্তক, মহীশাসক। এই সাতের মধ্যে মহাসাঙ্ঘিক বাদে বাকি ছয় শাখাই নিজেদের স্থবির নিকায়ের অনুসারী বলে দাবি করত। বিভাজ্যবাদ ছড়িয়েছিল দক্ষিণে, বাকি শাখাগুলি ছড়িয়েছিল উত্তরে। এখন স্থবির নিকায়ের মোটে তিনটি বিনয় টিকে রয়েছে,
১. বিভাজ্যবাদী শাখা থেকে বেরোনো পালি বিনয়, শ্রীলঙ্কা সহ দক্ষিণ-পূর্বের বৌদ্ধ দেশগুলি অনুসরণ করে;
২. সর্বাস্তিবাদী শাখা থেকে বেরোনো মূলসর্বাস্তিবাদী বিনয়, তিব্বতী বৌদ্ধরা অনুসরণ করেন;
৩. ধর্মগুপ্তকদের বিনয়, চীনের বৌদ্ধরা অনুসরণ করেন।
এখন স্থবির নিকায় বলতে পালি পিটকই সর্বাধিক প্রচলিত। সর্বাস্তিবাদী এবং অন্যান্য পিটকগুলির বহুলাংশ বিলুপ্ত। কিন্তু বাস্তবে উত্তরমুখী প্রসারধারাটির প্রভাব এদেশের ইতিহাসে দক্ষিণমুখী প্রসারধারাটির তুলনায় ঢের দীর্ঘস্থায়ী ছিল। নালন্দা মতো ঋদ্ধ মহাবিহারগুলির বেশিরভাগ উত্তরমুখী প্রসারধারাটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করত। ধরা যাক চন্দ্রগোমীর লোকানন্দ নাটকের কথা। মণিচূড়াবদান অবলম্বনে নাটকটি রচিত। পালি পিটকেও ভূরিদত্ত নামক নাগজন্মে[7] বোধিসত্ত্বের নিজের মাথার মণি দানের গল্প পাওয়া যায়, কিন্তু অবদানশতকের মণিচূড় জাতক আর পালি পিটকের ভূরিদত্ত জাতকের প্রেক্ষাপট একেবারে আলাদা। ভূরিদত্ত জাতক পড়ে মণিচূড়ের মাহাত্ম্য উপলব্ধি করা অসম্ভব। কেবল পঞ্চম শতকের চন্দ্রগোমী নন, ঊনবিংশ শতকের রবীন্দ্রনাথও যে বৌদ্ধ সংস্কৃতির অনুপ্রেরণায় শ্যামা বা চণ্ডালিকার মতো নৃত্যনাট্য রচনা করেছেন সেও ঐ সর্বাস্তিবাদী-মহাসাঙ্ঘিক অবদানসাহিত্যেরই উত্তরসূরি— পালি অপদান বা জাতকের জোগানো রসদ সে নয়। সর্বোপরি সর্বাস্তিবাদের অভিধর্ম দুই বলিষ্ঠ মহাযানদর্শনের বিকাশে প্রত্যক্ষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। নাগার্জুন বৈভাষিক পক্ষ খণ্ডন করে মধ্যমক শূন্যবাদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বসুবন্ধু বিজ্ঞানবাদ প্রতিষ্ঠার সময়ে সৌত্রান্তিক পক্ষের দিকে ঝুঁকেছিলেন। এমনকী শঙ্করাচার্য্যের ব্রহ্মসূত্রভাষ্যে যে তিন বৌদ্ধ মতের উল্লেখ রয়েছে তার মধ্যে প্রথম এবং একমাত্র স্থবির মত সর্বাস্তিবাদ, অপর দুই মত বিজ্ঞানবাদ এবং মধ্যমক। তাই সাধারণ অনুসন্ধিৎসুদের জন্য পালি পিটক যথেষ্ট হলেও মহাযান দর্শনের গবেষণাধর্মী অধ্যয়নে সর্বাস্তিবাদী অভিধর্ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।