Skip to main content
১২ কার্তিক ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার · ২৯ অক্টোবর ২০২৬
আনুপূর্বী বাংলা
✦ অতীত ও অনাগত-এর সন্ধিক্ষণে ✦
আসন্ন অনুষ্ঠান 31 Oct 2026
Exploring the Place of Devotion: Siting and Experiencing Divinity in Bengal-Vaishnavism
Sukanya Sarbadhikary
লেখা পাঠান

টার্মিনেটার ও একটি গ্রহের বিপন্নতা (পর্ব ৩)

প্রবেশক আমাদের টার্মিনেটর যন্ত্রটির স্বরূপ বোঝা দরকার। জেরি ম্যান্ডার তাঁর বইটির গোড়াতেই (The Capitalism Papers) একটি কাল্পনিক প্রশ্নোত্তরের সাহায্যে চমৎকারভাবে সেটা বুঝিয়েছেন। আমি সেই অংশটিই, হুবহু অনুবাদ না ক'রে সারসংক্ষেপ শোনাব। প্রশ্ন এই যে ব্যবসাবাণিজ্য মানেই কি পুঁজিতন্ত্র? নিশ্চয়ই তা নয়, ব্যবসাবাণিজ্য হাজার হাজার বছর আগেও ছিল, পুঁজিতন্ত্র আধুনিক মানুষের আবিষ্কার।
টার্মিনেটার ও একটি গ্রহের বিপন্নতা (পর্ব ৩)
দিল্লির বাজারে চাল বিক্রয়, ঊনবিংশ শতাব্দী (১৮০০–১৮৯৯), একজন ভারতীয় শিল্পীর জলরং চিত্র; সৌজন্য: Wellcome Collection, Public Domain Mark (রেফারেন্স: 575935i)

আমাদের টার্মিনেটর যন্ত্রটির স্বরূপ বোঝা দরকার। জেরি ম্যান্ডার তাঁর বইটির গোড়াতেই (The Capitalism Papers) একটি কাল্পনিক প্রশ্নোত্তরের সাহায্যে চমৎকারভাবে সেটা বুঝিয়েছেন। আমি সেই অংশটিই, হুবহু অনুবাদ না ক'রে সারসংক্ষেপ শোনাব।

প্রশ্ন এই যে ব্যবসাবাণিজ্য মানেই কি পুঁজিতন্ত্র? নিশ্চয়ই তা নয়, ব্যবসাবাণিজ্য হাজার হাজার বছর আগেও ছিল, পুঁজিতন্ত্র আধুনিক মানুষের আবিষ্কার। তার নতুনত্বটা কোথায় সেটা ম্যান্ডার এভাবে বোঝাচ্ছেন:

ধরা যাক, কারো একটা ফার্ণিচারের দোকান থেকে মাইনে পত্র সব চুকিয়ে যে লাভ হয় ওতে সংসার সচ্ছলভাবে চালানো ছাড়াও কিছু সঞ্চয় হল- এটা পুঁজিতন্ত্র নয়।

অবিরত বৃদ্ধিই পুঁজিতন্ত্রের চালিকা নিয়ম, এটা কোন ব্যক্তির ইচ্ছা বা অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে না, এটা এমন একটি ব্যবসা, যেখানে এগোতে হয় নইলে পিছিয়ে পড়তে হয়, বাঁচতে হলে ছুটতে হয়, না ছুটলে মৃত্যু

কিন্তু ধরা যাক ঐ দোকানমালিক অতিরিক্ত লাভ করায় হাতে। বেশ কিছু অতিরিক্ত পুঁজি এল এবং সেটা তিনি মাটিবাড়ির ব্যবসায় নিয়োগ করলেন, চাষজমি শস্তায় কিনে শপিং মল তুললেন; তারপর ঐ ব্যবসাটি বড় হতে থাকল, সারা দেশে বা একাধিক দেশে শপিং মলের চেইন খুললেন (ইতিমধ্যে দু-একজন পার্টনারের পুঁজিও এই লগ্নিতে যুক্ত হয়েছে); এখন যেহেতু তাঁর মূলধন অনেক তিনি বড় বড় ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ সহজেই পাবেন (ম্যান্ডার বলেননি, তবে আমাদের দেশে বড় ঋণ নিলে পুরোটা না চুকিয়েও বহাল তবিয়তে থাকা যায়, এটা 'বড়' হওয়ার সুবিধা); এখন এই বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে তিনি অনা ব্যবসা কিনতে শুরু করলেন (সেগুলো যা খুশি হতে পারে। পরিবহণ বা খনি বা কোন আধুনিক প্রযুক্তি); 'এখন তাঁর পুঁজি মূলত লগ্নি পুঁজি, শেয়ার বাজারে তাঁর গোষ্ঠীর শেয়ারের দাম বাড়াতে থাকাই তাঁর লক্ষা (তাঁর ব্যবসা কোল্ড ড্রিংকস থেকে বন্দর অবধি, বিচিত্রগামী); এখন তাঁর 'বড়ত্বের' সুবাদে অনায়াস আনাগোনা রাজনৈতিক ও সরকারী মহলে, নেতা ও আমলাদের পেছনে সামান্য খরচ করলেই শাসকের সিদ্ধান্তগুলি তাঁর পক্ষে যাবে, এতে জনস্বার্থকে কলা দেখিয়ে ব্যবসার বুলডোজার চালানো সহজ হবে (অরণ্য উচ্ছেদ, মানুষ উচ্ছেদ কি এমনি এমনিই হচ্ছে?) ট্যাক্সে ছাড় জুটবে, ইচ্ছেমত ছাঁটাই করার অনুমতি জুটবে। এটাই পুঁজিতন্ত্র।

এই সত্য কাহিনীটির সারসত্যটি কী? বৃদ্ধি। আর কিছুই নয়। ফার্নিচারও নয়, শপিং মলও নয়, খনির ব্যবসাও নয়। এই অবিরত বৃদ্ধিই পুঁজিতন্ত্রের চালিকা নিয়ম, এটা কোন ব্যক্তির ইচ্ছা বা অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে না, এটা এমন একটি ব্যবসা, যেখানে এগোতে হয় নইলে পিছিয়ে পড়তে হয়, বাঁচতে হলে ছুটতে হয়, না ছুটলে মৃত্যু। বৃদ্ধি শব্দটিতে দাগ দিন।

সাবেকী বেচাকেনার অর্থনীতি আর পুঁজিতন্ত্র মৌলিকভাবে আলাদা। সাবেকী বাজার একটি প্রয়োজন বিনিময়ের জায়গা। রাম কাপড় বিক্রী ক'রে টাকা পেল, টাকা দিয়ে চাল কিনল। শ্যাম চাল বিক্রী ক'রে টাকা পেল, তাই দিয়ে কাপড় কিনল। এটা একান্তই প্রয়োজন-চালিত ব্যবস্থা। পুঁজিতন্ত্র যাকে বলছি, সেখানে প্রয়োজন নিমিত্ত মাত্র, মূল ঘটনা মূলধনের বৃদ্ধি। ধরা যাক পুঁজিপতি কাপড় বেচে (এক্ষেত্রে কাপড় প্রয়োজন) যে অতিরিক্ত পুঁজি পেলেন, তা দিয়ে জমি কিনে তিনি গোলাপের চাষ করলেন অন্য একটি দেশে বেচার জনা, সেই মুনাফা দিয়ে মদের দোকানের চেইন খুললেন, তার মুনাফা দিয়ে বিল্ডারের ব্যবসা খুললেন। এখানে প্রয়োজনটা ছুতো মাত্র (প্রায়ই হয়ত সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় বা ক্ষতিকর জিনিষেরই ব্যবসা হচ্ছে; যেমন শীতল পানীয়, সিগারেট থেকে শুরু করে যুদ্ধাস্ত্র), মূল প্রক্রিয়াটা হচ্ছে টাকা দিয়ে টাকা বাড়ানো। প্রয়োজন আদৌ ধর্তব্য নয়। হয়ত স্থানীয় লোকের দরকার চালের, কিন্তু যদি ওর চেয়ে অন্য বাজারে গোলাপফুল বা যুদ্ধাস্ত্র বেচে বেশি লাভ হয়, তবে পুঁজি তাই করবে, করতে বাধ্য।

এই বাধ্যতাটা বুঝতে হবে, এটা ব্যক্তির প্রবৃত্তির উপরই শুধু নির্ভরশীল নয়, তার ব্যক্তিগত প্রয়োজনের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই (ব্যক্তি পুঁজিপতি হয়ত ডাল-রুটি আর ইসবগোল খায়, দানধ্যান করে), এটা পুঁজি-যন্ত্রের বাধ্যতা। শুধু মুনাফা যথেষ্ট নয়, সেই মুনাফার বৃদ্ধি দরকার। ছোট দোকানের মালিকের বছর বছর মোটামুটি একইরকম মুনাফা হলে চলে, কিন্তু পুঁজিপতি প্রতিষ্ঠানে যদি চক্রবৃদ্ধি না হয়, তবে লগ্নিকারীর লাভ কী? তিনি ত তাঁর লগ্নির ফসল অর্থাৎ সুদ চাইবেন, না পেলে তাঁর লগ্নি টাকা তুলে নিয়ে অন্য কোম্পানীতে খাটাবেন, এর অন্যথা কী ক'রে সম্ভব? ফলে, এটা অনিবার্য যে বৃদ্ধি না হলে কোম্পানীর মৃত্যু হবে। সুতরাং যিনি বা যাঁরা পুঁজি খাটাচ্ছেন, এবং যাঁরা ব্যবসার পরিচালনা করছেন তাঁরা ব্যক্তিগত জীবনে দুধসাবু খেয়ে বীতাপাঠ করলেও বৃদ্ধি বিনা তাঁদের নিস্তার নেই। অনন্ত বৃদ্ধি। Jason Hickel তুলনা করছেন ভাইরাসের সঙ্গে। কারণ, ভাইরাসের জীবনধর্ম বা গঠনধর্ম এমন যে সে অনবরত নিজের বৃদ্ধি করে যেতে বাধ্য। সে নিরুপায়। দুর্ভাগ্যবশত এই পুঁজিষন্ত্রটিও ধর্মত ঐরকম। প্রশ্ন এই যে, এই অনন্ত বৃদ্ধি কি এই গ্রহের দেহের জন্য ভাল?

'টার্মিনেটার ও একটি গ্রহের বিপন্নতা' — ধারাবাহিকের সূচিপত্র

মোট ৪টি পর্ব
Debashish tarafdar D
লেখক পরিচিতি
প্রোফাইল →

Debashish tarafdar

দেবাশিস তরফদার সত্তর-আশির দশকের একজন শক্তিশালী বাঙালি কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। মৌলিক কবিতার পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্য ও মনীষীদের জীবন নিয়ে গভীর মননশীল কাজের জন্য তিনি সমাদৃত। জেমস জয়েসের ইউলিসিস, গ্যেটে এবং জাপানি হাইকু ধারা নিয়ে তাঁর গবেষণামূলক বইগুলো পাঠকমহলে বিশেষভাবে প্রশংসিত।

স্বত্ব ও লাইসেন্স: এই রচনাটি CC BY-NC-ND 4.0 লাইসেন্সের আওতায় প্রকাশিত। মূল লেখকের নাম ও ‘আনুপূর্বী’ পত্রিকার সূত্র উল্লেখ সাপেক্ষে অবাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত।
গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা: এখানে প্রকাশিত লেখক, অতিথি ও অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য ও মতামত একান্তই তাঁদের নিজস্ব; তা Poorvam-এর নীতি বা অবস্থান প্রতিফলিত করে না।
সম্পর্কিত
বিভাগের আরও রচনা
লেখক সংগ্রহ

Debashish tarafdar-এর আরও লেখা

লেখকের সমস্ত রচনা