Skip to main content
১২ কার্তিক ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার · ২৯ অক্টোবর ২০২৬
আনুপূর্বী বাংলা
✦ অতীত ও অনাগত-এর সন্ধিক্ষণে ✦
আসন্ন অনুষ্ঠান 31 Oct 2026
Exploring the Place of Devotion: Siting and Experiencing Divinity in Bengal-Vaishnavism
Sukanya Sarbadhikary
লেখা পাঠান

টার্মিনেটার ও একটি গ্রহের বিপন্নতা (পর্ব ৪)

প্রবেশক বৃদ্ধির এই বাধ্যবাধকতা কি নৈসর্গিক? জীবনের শাশ্বত প্রয়োজন? নাকি পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার মৌলিক প্রয়োজন? বৃদ্ধির এই দর্শনকে আমরা মেনে নিয়েছি একমাত্র নিরন্তর প্রচারের ফলে, এবং নিজেদের চিন্তাশক্তির দুর্বলতা হেতু। ব্যবস্থা যারা চালায়, প্রচারক্ষমতা তাদের অপরিসীম, এবং 'বৃদ্ধি' একমাত্র তাদেরই কল্যাণ করে।
টার্মিনেটার ও একটি গ্রহের বিপন্নতা (পর্ব ৪)
বাংলার হুগলিতে ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যকুঠি (১৬৬৫), শিল্পী হেনড্রিক ভান স্কয়লেনবার্খ; সৌজন্য: Rijksmuseum, আমস্টারডাম

বৃদ্ধির বাধ্যতা। এই ধর্মটি বুঝতে পারলে সমস্ত অনিষ্টের বীজটিকে চেনা যায়। পুঁজিতন্ত্রকে দুটি সরল সূত্র দিয়ে আমরা বর্ণনা করতে পারি:

নিয়ম ১. যে কোন মূল্যে বৃদ্ধি

নিয়ম ২. যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে হলে, যে কোন সংশয় উপস্থিত হলে, নিয়ম ১ অনুসরণীয়।

আধুনিক কর্পোরেশন একটি যন্ত্র, তার নির্দিষ্ট পরিচালক নেই, লোক আসছে যাচ্ছে, ভূগোল নেই, কারণ পুঁজি এক সেকেণ্ডে অন্য দেশে চলে যেতে পারে। এটি একটি বিমূর্ত ব্যবস্থা, মনুষাকৃত অবশ্যই, তাকে আইনী সত্তা মানুষই দিয়েছে। কিন্তু যন্ত্র। অন্ধ যন্ত্র।

সুতরাং বৃদ্ধি ও নৈতিকতার দ্বন্দ্ব উপস্থিত হলে, বৃদ্ধিই অনুসরণীয়, নৈতিকতা নয়।

বৃদ্ধি ও পরিবেশের দ্বন্দ্ব উপস্থিত হলে বৃদ্ধিই অনুসরণীয়, পরিবেশ নয়।

বৃদ্ধি ও গণতন্ত্রের দ্বন্দ্ব উপস্থিত হলে, বৃদ্ধিই অনুসরণীয়, গণতন্ত্র নয়।

বৃদ্ধির পথে কেউ কাঁটা হতে পারে না, স্বাস্থ্য নয়, সৌন্দর্য নয়, শাস্তি নয়, ভালবাসা নয়; এককথায়, মানুষ নয়, কোন প্রাণী নয়, জল জঙ্গল আকাশ বাতাস, কেউ নয়।

কারণ, এটি একটি যন্ত্র বৃদ্ধি তার ধর্ম। প্রাণ তার পথের কাঁটা হতে পারে না। সে টার্মিনেটার।

টার্মিনেটার। বৃদ্ধির পথে কোন প্রাচীর দেখা দিলে সে সর্বশক্তিতে ওটিকে ভাঙবে। প্রয়োজনে যুদ্ধ করবে, দখল করবে, নির্বিচারে হত্যা করবে। যন্ত্রের কাছে বিবেক ও করুণা আশা করা মূঢ়তা।

এখানে ব্যক্তি নেই, দেশ নেই। আধুনিক কর্পোরেশন একটি যন্ত্র, তার নির্দিষ্ট পরিচালক নেই, লোক আসছে যাচ্ছে, ভূগোল নেই, কারণ পুঁজি এক সেকেণ্ডে অন্য দেশে চলে যেতে পারে। এটি একটি বিমূর্ত ব্যবস্থা, মনুষাকৃত অবশ্যই, তাকে আইনী সত্তা মানুষই দিয়েছে। কিন্তু যন্ত্র। অন্ধ যন্ত্র।

তাই, 'পুঁজিবাদ' লিখতে ইচ্ছা হয় না, কারণ 'বাদ' শুনলে একটি মতাদর্শের কথা মনে পড়ে। ও কোন মানবিক মতাদর্শ হতেই পারে না, এটা মনুষ্যকৃত একটি যন্ত্র যা তার স্রষ্টাকে গ্রাস করছে। তাই 'পুঁজিতন্ত্র' বলি। টার্মিনেটার।

এই 'বৃদ্ধি' একটি যান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা। এটা কি সত্যিই আমরা বুঝে উঠতে পেরেছি? এটা যে একটি অসম্ভবের পেছনে ছোটা, এটা যে উন্মাদ অবস্থা, এটা যে আমাদের বিবিধ সর্বনাশের মূল, এই কথা কি সত্যিই স্পষ্ট।

স্পষ্ট নয়। একটি বিরাট বৌদ্ধিক অস্পষ্টতা আছে এ বিষয়ে। নইলে দক্ষিণ, বাম, প্রায় সবাই, পন্থানির্বিশেষে 'বৃদ্ধি'কে স্বতঃসিদ্ধ মনে করেন কেন? জাপানের মনীষী মাসানোবু ফুকুওকা (১৯১৩-২০০৮) প্রশ্ন করেছিলেন: ০% বৃদ্ধিতে ক্ষতি কী? আমি নিশ্চিত, আজও আমরা এই প্রশ্নটি নিয়ে তলিয়ে ভাবিনি, উদ্ভট জ্ঞানে প্রশ্নটিকে এড়িয়ে গেছি।

বৃদ্ধির এই বাধ্যবাধকতা কি নৈসর্গিক? জীবনের শাশ্বত প্রয়োজন? নাকি পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার মৌলিক প্রয়োজন? বৃদ্ধির এই দর্শনকে আমরা মেনে নিয়েছি একমাত্র নিরন্তর প্রচারের ফলে, এবং নিজেদের চিন্তাশক্তির দুর্বলতা হেতু। ব্যবস্থা যারা চালায়, প্রচারক্ষমতা তাদের অপরিসীম, এবং 'বৃদ্ধি' একমাত্র তাদেরই কল্যাণ করে।

আমরা এখন পরপর দেখব  : 

১. এই 'বৃদ্ধি'র বাধ্যবাধকতা কতরকমভাবে সংকটের সৃষ্টি করেছে 

২. 'বৃদ্ধি'-র নৈসর্গিক সীমা এবং সেই সীমাকে ডিঙিয়ে যেতে পুঁজিতন্ত্র কী কী পথ অবলম্বন করতে চাইছে 

৩. আমাদের সামনে সুস্থতর বিকল্প কী কী আছে। কিন্তু তার আগে পুঁজিতন্ত্রের ইতিহাসের দিকে অল্প তাকানো দরকার।


← পূর্ববর্তী পর্ব (Previous Episode) টার্মিনেটার ও একটি গ্রহের বিপন্নতা (পর্ব ৩)
পরবর্তী পর্ব → পরবর্তী কিস্তি শীঘ্রই প্রকাশিত হবে...

'টার্মিনেটার ও একটি গ্রহের বিপন্নতা' — ধারাবাহিকের সূচিপত্র

মোট ৪টি পর্ব
Debashish tarafdar D
লেখক পরিচিতি
প্রোফাইল →

Debashish tarafdar

দেবাশিস তরফদার সত্তর-আশির দশকের একজন শক্তিশালী বাঙালি কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। মৌলিক কবিতার পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্য ও মনীষীদের জীবন নিয়ে গভীর মননশীল কাজের জন্য তিনি সমাদৃত। জেমস জয়েসের ইউলিসিস, গ্যেটে এবং জাপানি হাইকু ধারা নিয়ে তাঁর গবেষণামূলক বইগুলো পাঠকমহলে বিশেষভাবে প্রশংসিত।

স্বত্ব ও লাইসেন্স: এই রচনাটি CC BY-NC-ND 4.0 লাইসেন্সের আওতায় প্রকাশিত। মূল লেখকের নাম ও ‘আনুপূর্বী’ পত্রিকার সূত্র উল্লেখ সাপেক্ষে অবাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত।
গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা: এখানে প্রকাশিত লেখক, অতিথি ও অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য ও মতামত একান্তই তাঁদের নিজস্ব; তা Poorvam-এর নীতি বা অবস্থান প্রতিফলিত করে না।
সম্পর্কিত
বিভাগের আরও রচনা
লেখক সংগ্রহ

Debashish tarafdar-এর আরও লেখা

লেখকের সমস্ত রচনা