অল্প বয়সে ভাসাভাসা বোধ থেকে মনে হত পুঁজিতন্ত্রের সমস্যাটা শুধুই অসম বাঁটোয়ারার সমস্যা। ক্রমশ দেখা গেল, সংকট এর চেয়ে গভীর। শুধু অসাম্য, দারিদ্র্য, আর্থিক শোষণ নয়, দেখা গেল যে-প্রাণসঙ্ঘের আমরা পরস্পর-নির্ভরশীল অংশ, সেই ধরিত্রীই পুঁজিতন্ত্রের সীমাহীন দোহনে রুগ্না, আশুমৃত্যুর অপেক্ষায়। শুধু এও নয়। দেখলাম, এই ব্যবস্থা মানুষকে প্রতিদিন দেহে-মনে-পরাণে-আত্মায় ছিবড়ে করছে, বিকৃত করছে, অসুন্দর ও অমানুষ করছে। যন্ত্র করছে। যন্ত্রের ঐ টার্মিনেটারের যেমন-কোন শুভাশুভ নেই, কোন শ্রী-বিশ্রী নেই, সুখদুঃখ নেই, ভালবাসা নেই, চারপাশে তাকালে, ন্যূনতম অনুভূতি থাকলে, পাঠক, আপনিও এটা দেখতে পান, হয়ত কারণটা স্পষ্ট হয় না।
মানুষের এই কুষ্ঠ আপনিও দেখতে পান, যদি না নিজেও খুব বেশি কৃষ্ঠাক্রান্ত হয়ে থাকেন। হয়ত টুকরো টুকরো অসঙ্গতি হিসেবে তাদের দেখেন, যোগসূত্রটি দেখতে পান না। আপনি দেখেন যুদ্ধবিগ্রহ, গণহত্যা, দাঙ্গা, জালজুয়াচুরি, অনিঃশেষ মিথ্যাচার, আত্মহত্যা, উন্মাদাগার, ধর্ষণ, ইত্যাদি ইত্যাদি। খবরের কাগজ বা খবরের বাক্স খুলে নিত্য এই বিষ্ঠা সেবনে আপনি অভ্যস্ত।
আপনার মনে ভ্রম হয়, এ বোধহয় অমুক বা তমুক দলের সমস্যা। অথবা, নিছক নৈতিক অবনতি। বা; পরিচালনার সমস্যা। শিক্ষার উৎকর্ষের অভাব। তাই আপনি ভোট দেন, দল বদলান, গুরুর কাছে যান বা গুরু বদলান, ছয় মাসে সুখী হওয়ার মন্ত্র বাতলানো বেস্টসেলার কেনেন। 'শিক্ষিত' নেতার পেছনে ছোটেন। প্রযুক্তির কাছে অন্তিম সমাধান আশা করেন।
কিন্তু… বারবার প্রবঞ্চিত হন। হতাশ হন। অন্ধের হ'তীদর্শনের মত আমরা অন্ধের টার্মিনেটার-দর্শনেই অভ্যস্ত। তাই টার্মিনেটারের স্বরূপ দর্শন গুরুত্বপূর্ণ। নইলে, শুধু উপসর্গ নিয়েই উদ্ব্যস্ত হব। উপসর্গ খবরের হেডলাইন মাত্র।
তবু, মূল রোগে প্রবেশের পূর্বে সংক্ষেপে কিছু হেডলাইনেও তাকাব। মনের আলস্য ভাঙার জন্য। তবে, অবশ্যই হেডলাইনে আটকে থাকব না।
পত্রপত্রিকা বা অসংখা বই খুললেই আমরা সেই হেডলাইনগুলি দেখতে পাই। যেমন:
(২০১৭-র খবর) জার্মানীর প্রকৃতিভাণ্ডার থেকে বিগত ২৫ বছরে তিন-চতুর্থাংশ পতঙ্গ লোপাট হয়ে গেছে।
(২০১৮, রাষ্ট্রসঙ্ঘের পরিবেশসংক্রান্ত প্রতিবেদন) আমাদের ধরিত্রীর ৪০% মৃত্তিকা গুরুতরভাবে বিনষ্ট হয়ে গেছে, তার আর উর্বরা শক্তি নেই। কৃষিযোগা মৃত্তিকা যে-হারে সৃষ্টি হচ্ছে তার ১০০ গুণ বেশি হারে অবলুপ্ত হচ্ছে।
(২০১৮, গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ) এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ২০৪৮ নাগাদ মাছ ফুরিয়ে আসবে।
তবু, হেডলাইনগুলি আমাদের খুব একটা শান্তিভঙ্গ করে বলে মনে হয় না। প্রাত্যহিক সংবাদের দীপাবলীতে এক-একটি হাউইর মত দেখা দিয়ে হারিয়ে যায়।
অতি অদ্ভুত আয়-বৈষম্যের খবর যেমন, যতক্ষণ নিজের আয় সুরক্ষিত, খবর মাত্র, রোমাঞ্চক নয়, দলাদলি গালাগালি সিনেমা ও ক্রিকেটের মত রোমাঞ্চক নয়। বেরোজগারী, গৃহযুদ্ধ, পুকুরচুরি, ক্ষুধা, অরণ্য উচ্ছেদ, মানুষ উচ্ছেদ, সবই ত 'অন্যত্র' ঘটছে! অথচ উপরে যে হেডলাইনগুলি বেছে নিয়েছি, তা ত সমগ্র মানবজাতির, সমগ্র ধরণীর আয়ুর সঙ্গে জড়িত। তবুও সেই হেডলাইন মৃদু কম্পন জাগিয়ে শেষ হয়ে যায়, ভূমিকম্প মৃদু হলে যেমন আমরা পরক্ষণেই ভুলে যাই। টলস্টয়ের 'ইভান ইলিচের মৃত্যু' গল্পের পড়োশীদের মত আমাদের একটি চোরা নিশ্চিতি থাকে যে মরেছে সে ইভান ইলিচ, আমি নই।
তাই, হেডলাইন ছুঁড়ে লাভ নেই। সে, কাগজের রকেটের মত, কারো নিদ্রা ভাঙাবে না।
কিন্তু পাঠক, আপনার ব্যক্তিজীবনও কি সত্যিই আগুনের আঁচ থেকে মুক্ত? শুধুমাত্র আর্থিক লাভালাভকে কেন্দ্র ক'রে ক্রমশ আপনার জীবন আবর্তিত হচ্ছে, শুধুমাত্র বেচাকেনাকে কেন্দ্র ক'রে আপনার পরিবেশ আবর্তিত হচ্ছে, এখানে সুন্দর-অসুন্দর ভাল-মন্দ প্রেম-অপ্রেম ক্রমশ অর্থহীন, আনন্দ বিস্মৃত, শান্তি বিস্তৃত, শুধুমাত্র টিকে থাকতে আপনি ছুটছেন। ছুটছেন, কারণ সবাই ছুটছে, নইলে পিছিয়ে পড়বেন। এই জীবন কি মনোরোগীর জীবন নয়?
অথচ জীবন অন্যরকম ছিল। আমরা যারা ষাট বছর পঞ্চাশ বছর আগে বেঁচে ছিলাম, চোখ বুজে ব্যক্তিগত টাইম মেশিনে উঠলেই স্মরণ করতে পারি, প্রায় অন্য একটি গ্রহের কথা, যেখানে অনেক বেশি অবকাশ ছিল, অহৈতুকী আনন্দ (অর্থাৎ প্রকৃত আনন্দ) ছিল, উদ্বেগ কম ছিল, ছোট ছোট সমাজ ছিল, অসংখ্য সম্পর্ক ছিল, ঘাসের গন্ধ লক্ষ করা যেত, দিবারাত্রির চক্র, ঋতুচক্র অনুভব করা যেত।
এ শুধু আমাদের মত 'পশ্চাৎপদ' দেশের মফম্বেলী অতীতের পাঁচালী নয়। আমেরিকার মহান লেখক রে ব্র্যাডবেরীর বিখ্যাত বই Dandelion Wine বইটিতে তাঁর আট বছর বয়সের (১৯২৮) মফস্বল পৃথিবীর (Waukegan, Illinois) যে অনিঃশেষ রূপরসগন্ধ আছে, সেও তো এক দূরের পাঁচালী। সেই 'কালহীন' কাল হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যে গেছে, তা ঐ লেখকেরই Fahrenheit 451 বইটিতে একটি মেয়ে বলে- বলে যে, ক্রমশ আমাদের গাড়ির বেগ এত বেড়ে গেছে যে একটি ঘাসের ডগা আর আমরা দেখতে পাই না, বড়জোর একটি সবুজ ছোপ চোখে পড়ে। এই দৃশ্যটি আমাদের জীবনের প্রতিমা, সে-জীবন ছুটছে, কারণ সবাই ছুটছে, হাইওয়ের গাড়ির মত, চাইলেই সে গতিবেগ কমাতে পারে না। তার জীবন থেকে ঐ ঘাস, ঘাসের ডগার শিশিরকণা অবলুপ্ত। যে অসংখ্য সূক্ষ্ম সৌন্দর্য ও ছোট ছোট আনন্দ ছোট হাসিকান্না নিয়ে জীবনের ঐশ্বর্য, তার অবলোপও এই গ্রহের জীববৈচিত্র্য অবলোপ বা খনিজ সম্পদ অবলোপের চেয়ে কম বিপর্যয় নয়।
একসময় আমরা অনেকেই আর এই মানসিক সম্পদ অবলোপের কথা চিন্তা করি না। এইভাবে প্রতিদিন ঊনমানব হতে থাকি। সেই থেকে অবমানব কত দূর?
ক্রমশ সব কিছু, আমাদের গাছপালা, মাঠ, আলো বাতাস, আমাদের তৃষ্ণার জল, এমন কি স্নেহভালবাসা, সেবা, সমস্তই বেচাকেনা ও লাভক্ষতির অধীন হয়ে আসে। (বিমানসেবিকার হাসির মত।) এই গাড়ি ছুটছে এক ক্রমঘন নিরানন্দের দিকে। কিন্তু গাড়ি থেকে নামার উপায় নেই। খাদে না পড়া পর্যন্ত।
এইভাবে মানুষ তার মন, আত্মা হারিয়ে জড়পদার্থে, যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে। আমরা যদি অসাম্যে, অনৈতিকতায় বিচলিত নাও হই, ধরিত্রীর মরণদশাতেও যদি বিপন্ন না হই- কেউ কেউ হয়ত গ্রহান্তরে চলে যেতে রাজী- তবুও, আমার প্রশ্ন, নিজের জীবনের এই ক্রমঘন নিরানন্দে, মানসিক দারিদ্র্যে, অর্থহীনতায় আমরা কি আতঙ্কিত নই? এখানেই ভয় হয়, আমরা কেউ কেউ কি সত্যিই অবমানব হয়ে গেছি (পশু নয়, পশুর আনন্দ ও বিশ্রাম থাকে) অজান্তে, ইয়োনেস্কোর নাটকের গণ্ডারের মত? তবু আমাকে লিখতে হবে, যারা এখনও মানুষ, তাদের জন্য।