Skip to main content
১০ আশ্বিন ১৪৩৩
রবিবার · ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আনুপূর্বী বাংলা
✦ অতীত ও অনাগত-এর সন্ধিক্ষণে ✦
পূর্বম সেমিনার ও আলোচনা সভা
লেখা পাঠান
জন্মান্তর
19 মিনিট পাঠ

জন্মান্তর

বিশ বছর আগে স্ত্রী শঙ্করীর মৃত্যু হয়েছিল এক অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি রেখে—পরজন্মে একই রূপে ফিরে এসে আবার দেখা হবে। সেই প্রতিশ্রুতিকে আঁকড়ে ধরে বিনায়ক দীর্ঘ বিশ বছর অপেক্ষা করে। অগ্রদ্বীপের গোপীনাথের মেলায় এক যুবতীর সঙ্গে আকস্মিক সাক্ষাৎ তাকে বিশ্বাস করায়, এই শঙ্করীই তার মৃত স্ত্রীর পুনর্জন্ম। নাম, জন্মতারিখ, শারীরিক চিহ্ন ও স্মৃতির নানা সূত্রে অতীত ও বর্তমানের অদ্ভুত যোগসূত্র তৈরি হয়। কিন্তু পুনর্জন্মের সত্যের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে স্মৃতি, ভালোবাসা, সংশয় এবং হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ককে আবার ফিরে পাওয়ার মানবিক আকাঙ্ক্ষা।
লেখক
আশ্বিন ১৪৩৩
অক্ষরের মাপ:
শেয়ার ও ফিড: RSS

টায় টায় কুড়ি বছর আগে শঙ্করী মারা গেছিল। মরার সময় বলেছিল, কুড়ি বছর পর তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে। আমি এই রূপেই জন্ম নেব। বলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল।

বিনায়ক ক্যালেন্ডারের দিকে তাকাল। আজ পয়লা জানুয়ারি। তার এখন পঁয়তাল্লিশ। শঙ্করী জন্ম নিলে হবে কুড়ি। জন্ম নিয়েছে কিনা কে জানে। নিয়ে থাকলে দেখা হবে। সেই আশাতেই বিনায়ক যেখানেই যায় সেখানেই শঙ্করীকে আতিপাতি করে খোঁজে।

শঙ্করী এই জন্মে কি পরিচয় নিয়েছে কে জানে? গত জন্মের নাম ওর মনে থাকবে কি? তাছাড়া নবজাতকের নাম রাখে বাবা-মা। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। শঙ্করীকে চেনা যাবে গত জন্মের রূপ পেলে।

যে নিজে হারাতে চায়, তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না।

শঙ্করীর জন্য কুড়ি বছর অপেক্ষা করে আছে। বিনায়ক আর বিয়ে করেনি। ওদের বিবাহিত জীবন মাত্র চার মাস। ব্রেস্ট ক্যান্সার ওকে কেড়ে নিল। উনিশে বিয়ে। বিনায়কের তখন চব্বিশ। হাই স্কুলে চাকরি পেল। সম্বন্ধ করে পূর্ব বর্ধমানের সমুদ্র গড়ে বিয়ে করল। বিয়ের চার মাসের মাথায় ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়ল। বেশ কয়েকবার কেমো দেওয়া হল। ধীরে ধীরে ওর কোমর ছাপানো চুল উঠে গেল। শেষের দিকে মাথায় চুল পরতে লাগলো। ওকে দেখে ভীষণ কষ্ট হত। তাতে মনে এত যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তি পেলে শঙ্করের কষ্টটা কমত।

বিনায়ক ফোঁস করে একটা শ্বাস ছেড়ে ঘড়ি দেখল। বিকেল পাঁচটা বাজে। সকাল থেকে মন উচাটন। খুব করে শঙ্করীর কথা মনে পড়ছে। তাই বিকেলে বেরিয়ে পড়েছে অগ্রদ্বীপের গোপিনাথের মেলার উদ্দেশ্যে। পূর্ব বর্ধমানের ক্ষুদ্র জনপদ গোপীনাথ ও বৈষ্ণব সাধক গোবিন্দ ঘোষের জন্য ফি বছর চৈত্র মাসের কৃষ্ণ পক্ষের একাদশী তিথিতে এখানে মেলা বসে। মেলাটি অগ্রদ্বীপের গোপীনাথের মেলা নামে পরিচিত। চারপাশের এক-দুই কিমি এলাকা মিলন তীর্থের চেহারা নেয়। লাখ লাখ লোক আসে। ফাগুন মাসে অগ্রদ্বীপে ভক্ত গোবিন্দ ঘোষের কাছে এসেছিলেন শ্রীচৈতন্য। এখানে তিনি একটি কৃষ্ণের বিগ্রহ তৈরি করেন। তার নাম দেন গোপিনাথ। জনশ্রুতি আছে শিশু পুত্রকে হারিয়ে গোবিন্দ ঘোষ পাগলের মত হয়ে যান। সেই সময় গোপীনাথ তাকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে পুত্র হিসেবে গোবিন্দ ঘোষের শ্রাদ্ধ করার আশ্বাস দেন। সেই জন্য গোপীনাথ গোবিন্দ ঘোষের মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধ করে। প্রায় 8৪১ বছর এই মেলা চলে আসছে। সেই মেলা দেখতে বিনয় অগ্রদ্বীপের ঘাটে এসে অবাক হল। চারদিক লোকে লোকারণ্য। লোক আসছে যাচ্ছে। কাল সারাদিন টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়েছে। তাই আজ লোকের ভিড় বেশি। কাল যারা আসতে পেরেছে তারা ফিরে যাচ্ছে।

বিনায়ক মাঝ গঙ্গায় এসে দেখল অসংখ্য নৌকো যাত্রী পারাপারের জন্য অপেক্ষা করছে। ঘাটের কাছে চড়া পড়তে নৌকোগুলো ঘুরে যাচ্ছে। তাতে সময় বেশি লাগছে। সবাই দাঁড়িয়ে আছে। নৌকো ধীরে ধীরে ঘাটে ভিড়ল। দেখল যাত্রীরা নামা শুরু করেছে। কারো তোর সইছে না। সবার শেষে বিনায়ক নামল। নেমে পারের কড়ি মিটিয়ে মন্দিরের দিকে পা বাড়াল। রাস্তার দু'পাশে সার দিয়ে সাধু-সান্ত্রীরা কাপড় বিছিয়ে রেখেছে। কেউ কেউ চাল আলু টাকা-পয়সা দিচ্ছে।কেউ টাকাপয়সা দিচ্ছে। দেখতে বিনায়ক নাকে দুর্গন্ধ পেল। রাস্তার দু'পাশে কাঁচা পায়খানা। তার দুর্গন্ধে সবাই নাক চেপে দ্রুত পথ টুকু পেরিয়ে যাচ্ছে। বিনায়ক পেরোল। লোকের জন্য হাঁটতে হচ্ছে ধীরে ধীরে। হেঁটে চৌরাস্তায় এসে দাঁড়াল। গাছের তলায় দাঁড়িয়ে পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরিয়ে টানতে লাগল। রাস্তা অনেক দূর পর্যন্ত চলে গেছে। কিছুটা গিয়ে ডান দিকে গেছে। তারপর গোবিন্দ ঘোষের সমাধি। পাশেই গোপীনাথের মন্দির। বিনায়ক অনেকবার এসেছে। সোজা পথ না ধরে বাঁধের উপর দিয়ে গিয়ে বামে নেমে গেলে মন্দিরে অল্প সময়ে যাওয়া যায়। ওই পথে বড় বড় আখড়া পড়ে। রাস্তার দু'ধারে অনেক দোকান বসে। খাবারের দোকান মিষ্টির দোকান কাঠের দোকান দাতে বসে বেশ বিক্রি হয়। মেলা চলে তিন দিন। এই তিন দিনে লাখ লাখ লোক আসে। আবার ফিরে যায়। আবার আসছে বছর আসবে ঠিক করে নেয়।

বিনায়ক সিগারেট শেষ করে শর্টকার্ট পথ ধরল। রাস্তাটা কংক্রিট। কোথাও কোথাও জল জমেছে। সাবধানে পথ দেখে হাঁটতে হাঁটতে একটা ধাক্কা খেলো পড়তে পড়তে উঠে দাঁড়িয়ে দেখল কে যেন জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেল।

 

দুই

 

বিনায়ক মন্দিরের দিকে না গিয়ে কংক্রিট রাস্তায় এল। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল হঠাৎ শাড়ির খসখস আওয়াজে স্বচকিত হল এবং সামনে দাঁড়াল। এক যুবতি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল খপ করে ওর হাত চেপে ধরল, কি ব্যাপার ধাক্কা মারলেন কেন?

যুবতি থর থর করে কেঁপে উঠল, ওরা আমাকে ধাওয়া করেছে।

কারা?

জানিনা।

তাহলে এখানে থাকা নিরাপদ নয়। চলো একটু দূরে যাই।

আমাকে ছেড়ে দিন।

না। তুমি বোধহয় অবৈধ কিছু করেছ। বিনায়ক বলেই যুবতিকে টানতে টানতে পাটুলির দিকে নিয়ে গেল। একটা ল্যাম্প পোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে যুবতির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল, শঙ্করের তুমি!

যুবতি চমকে উঠল, কে আপনি?

আমি বিনয়ক। বিনায়ক বলেই দেখল যুবতির ধুতনিতে একটা তিল। ডান গালে জরুল। তা দেখে আবার বলল, তুমি শঙ্করী।

হ্যাঁ। আমার নাম শঙ্করী কিন্তু...

আমি বিনায়ক। তোমার গত জন্মের স্বামী।

স্বামী!

হ্যাঁ। কুড়ি বছর আগে ব্রেস্ট ক্যান্সারে মারা গেছিলে। মরার সময় বলেছিলে তুমি স্বরূপে আবার জন্ম নেবে।

আশ্চর্য। আমার নামও শঙ্করী। বয়সও কুড়ি।

গত জন্মে তোমার থুতনিতে তিল ছিল। ডান গালে জরুল। আরো বলব?

বলুন।

তোমার বুকে একটা শ্বেতির ডাক আছে।

আশ্চর্য।

আরো শুনবে?

আরো আছে?

হ্যাঁ।

বলুন।

তোমার যোনিবেদীর উপরে ও জরুল আছে।

শঙ্করী চমকে উঠল।

কি আছে তো?

হ্যাঁ। শঙ্করী লজ্জায় মুখ নিচু করল।

চলো কোথাও গিয়ে একটু বসি। তোমাকে আর একটা জিনিস দেখাব। বিনায়ক বলেই শঙ্করের হাত ধরে আরেকটু এগিয়ে গেল। রাস্তার ডান পাশে নেমে গেল। দূরে রিভার পাম্প হাউস দেখতে পেল। আলো জ্বলছে দেখে এগিয়ে গেল। পাম্প হাউসের কাছে গিয়ে দেখল জায়গাটা বেশ নির্জন। দু'জনে বারান্দায় বসল। মোবাইল বের করে একটা ছবি দেখতে শঙ্করী হাতে দিল, দেখো।

শঙ্করী ছবিটার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল। বধূ বেশে তারই ছবি। হুবহু এক। ছবিটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

এবার বিশ্বাস হল?

এরকম হয়?

নিজের চোখেই তো দেখলে।

দেখলাম।

তোমার জন্ম তারিখ মনে আছে?

২০০৩-এর পয়লা জানুয়ারি।

শঙ্করী মারা যায় ২০০৩-এর পয়লা জানুয়ারি। সকাল দশটায়।

আমার জন্ম ঐদিন দুপুর ১২ টায়।

কোথায়?

বহরমপুর।

তাই। বিনায়ক বলেই পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল।

 

তিন

 

এক মুখ ধোয়া ছেড়ে বিনায়ক বলল, তুমি কি কোন আখড়ায় উঠেছ?

হ্যাঁ। রাধা কৃষ্ণ আশ্রমের আখড়ায়।

তোমার বাবা-মা এসেছে?

না।

রাধা কৃষ্ণ আশ্রমটা কোথায়?

বহরমপুরের কোর্টের কাছে।

আখড়ার মালিক কে?

মালকিন। আন্নাকালী দাসী।

আমি তোমার বাবা মার সঙ্গে দেখা করতে চাই।

কেন?

আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।

যাহ!

 হ্যাঁ। তোমার আমার বিয়ে আগেই ঠিক হয়ে আছে। তুমি বলেছিলে কুড়ি বছর পর তোমার সঙ্গে দেখা হবে। আমি এই রূপেই জন্ম নেব।

বলেছিলাম বুঝি?

হ্যাঁ। বলেছিলে। বিনায়ক বলেই শঙ্করীকে বুকে টানল, তোমার জন্য কুড়ি বছর অপেক্ষা করে আছি।

আমাকে চেনেন না জানেন না বিয়ে করবেন?

হ্যাঁ। তুমি আমার প্রয়াত স্ত্রী শঙ্করী।

শঙ্করী হাসল, কিছু চিহ্ন মিলে গেছে ঠিকই তাই বলে...

চিহ্ন গুলো আমি দেখতে চাই।

যাহ!

উপরে সব মিলে গেছে নিচে দেখতে চাই। প্লিজ না করো না। বিনায়ক বলল, কুড়ি বছর অপেক্ষায় আছি এই দিনটার জন্য।

আমার কুড়ি আপনার বয়স কত?

হিসেব মতো পঁয়তাল্লিশ।

আমার বাবার বয়সী। শঙ্করী বলল, ও কি করছেন?

বিনায়ক ব্লাউজের বোতাম খুলতে যাচ্ছিল। থমকে গেল, আমি কোন অসভ্যতা করব না।

ব্লাউজের বোতাম খোলাই তো অসভ্যতা।

প্লিজ আমাকে একটু বোঝার চেষ্টা করো।

নিন। বলেই শঙ্করি চোখ বুজল। মনে মনে বলল কি আছে কপালে কে জানে? প্রতি বছরই আসি কোন বার এমন পাগলের পাল্লায় পরিনি।

বিনায়ক ব্লাউজের সবকটা বোতাম খুলে ব্রা উপরে তুলে চোখ রাখল। হ্যাঁ, দুই বুকের মাঝে চার আনা সাইজের শ্বেতির দাগ। দাগটা আট আনার সাইজে ছিল। ওর জীবের স্পর্শে সেটির দাগ চার আনায় পৌঁছেছিল। তাই বলল, শ্বেতির দাগ আগে আট আনা কয়েনের মতো ছিল সেটা চার আনা কয়েনের সাইজে এসেছিল।

আশ্চর্য!

আশ্চর্য বটে। বিনায়ক বলল, দেখবে এই দাগ টাও আমার জিভের ছোঁয়ায় চার আনায় দাঁড়াবে।

 শঙ্করীর কেমন যেন কৌতুহল হল। বলল, সত্যি!

সত্যি। বিনায়ক জিভ ছোঁয়াল।

 শঙ্করী চুপ করে রইল। বিনায়ক ওর নীরবতা সম্মতির লক্ষণ ধরে মুখ নামাল। শঙ্করী চোখ বুজে দুই বুকের মাঝ বরাবর জীবের স্পর্শ পেয়ে শিউরে উঠল, আহঃ

বিনায়ক শ্বেতী দাগে জীভ বুলোতে বুলোতে কাপড় শায়ার উপর দিয়ে আঙ্গুলের স্পর্শে জড়ুল টের পেয়ে বলল, তুমি আমার শঙ্করী।

আমি কিছু টের পাচ্ছি না কেন?

পাবে।

কিভাবে?

তোমার আমার মিলন হলে তোমার পূর্ব জন্মের কথা মনে পড়বে।

শঙ্করী চোখ বড় বড় করে বিনায়কের দিকে তাকাল।

 

চার

 

বিনায়ক পকেট থেকে রুমাল বের করে জ্বলন্ত বাল্বটাকে ঢেকে শঙ্করীকে পাশে বসাল, এবার দূর থেকে কেউ আমাদের দেখতে পাবে না।

আর কতক্ষণ থাকব এখানে?

যতক্ষণ না তোমার গত জন্মের কথা মনে পড়ে...

আমার তো কিছুই মনে পড়ছে না। শঙ্করী বলল, আমার শরীরের কিছু চিহ্নের সঙ্গে গত জন্মের শঙ্করীর আশ্চর্য মিল আমাকে ভাবাচ্ছে। নাম এক। আমরা দেখতেও এক। গত জন্মে আমরা স্বামী-স্ত্রী ছিলাম। নইলে আমার গোপনাঙ্গের জরুলের কথা জানবেন কি করে?

যাক। তুমি স্বীকার করলে। এবার দেখবে সব তোমার মনে পড়বে।

না।

না কেন?

আমার ভয় করছে।

ভয় কি? আমি তো আছি। বিনায়ক বলল, তোমার আমার দেখা পূর্ব নির্ধারিত ছিল। নইলে দেখা হবে কেন?

 শঙ্করী কি বুঝল কে জানে একটু সরে বসল। বিনায়ক ওকে আরো কাছে টানল। শঙ্করী একটু কাঁপছে যেন। গত দু'দিন ধরে থেকে থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। উত্তরে হাওয়া বইছে। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া। তাতেই কাঁপছে। তাই বলল, শীত করছে।

কাছে এস।

শঙ্করী আরো সরে এল। বিনায়ক ওকে কোলে শুয়ে দিল। ঠোঁটে আঙ্গুল গুলোতে লাগল। শঙ্করী আঙ্গুল কামড়ে দিল, কেমন লাগল?

এভাবেই তোমাকে জড়িয়ে ধরতাম। তুমি গত জন্মেও এভাবে আঙ্গুল কামড়ে দিতে।

আমি কি করিনি বলুন তো?

কখনো ঝগড়া করনি।

আর?

আমাকে না বলে কোথাও যাওনি।

ধুর। এ তো সব মামুলি ব্যাপার।

তোমার কাছে এগুলো মামুলি হতে পারে আমার কাছে এগুলো অমূল্য রত্ন খচিত স্মৃতি। এই স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছি। বিনায়ক বলেই দেওয়ালে পিঠ ঠেকাল, তোমাকে সব বললাম। এবার তুমি সিদ্ধান্ত নেবে কি করবে?

খুব সমস্যায় ফেললেন। শঙ্করী বলল, আপনার এই জন্মান্তর নিয়ে আমার মধ্যে কোন পরিবর্তন টের পাচ্ছি না। হতে পারে সবটাই কাকতালীয়। আবার মনে প্রশ্ন জাগে তাই বা হবে কেন? আবার আমার সঙ্গেই বা হবে কেন?

এতকিছু মিলের পরও সংশয়?

আপনি শঙ্করী কে খুব ভালবাসতেন? শঙ্করী দুম করে প্রশ্ন করে উঠে বসল।

এক গ্রামেই আমাদের বাড়ি। ছোট থেকে ওকে দেখেছি। বিনায়ক বলল, চাকরি পেয়ে ওদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালে ওরা রাজি হয়। সেই মতো আমাদের সামাজিক বিয়ে হয়।

এতে কোন প্রেমের গল্প নেই।

বিয়ের পর ওর প্রেমে পড়লাম। কয়েকমাস চুটিয়ে প্রেম করেছি। তারপর...

তারপর...

তারপরেই কালবৈশাখীর ঝড় নেমে এ। বিনায়কের গলা ধরে এল। শঙ্করীর শেষ কথাটা মনে রেখে কুড়ি বছর পার করে দিলাম। আজ ও প্রতিবারের মতো মেলায় এলাম। মন বলল তোমার দেখা পাব। পেলাম। তুমি বলেই, বিনায়ক চোখ মেলল। দেখল ওর পাশে শঙ্করী নেই। এই ছিল এই নেই। কোন ফাঁকে উঠে চলে গেছে। সে টের পায়নি।

 

পাঁচ

 

বিনায়ক মনঃক্ষুণ্ণ হল। এভাবে ফাঁকি দিয়ে শঙ্করী পালাবে ভাবতে পারিনি। সে একটু ভাবুক হয়ে পড়তে সংকারী পালাল। আর তাতেই নিজেকে বড় নিঃস্ব মনে হল। বুকটা ফাঁকা ফাঁকা লাগল যেন সমান ভাবে মনে আঘাত দিল। আঘাত সহ্য করতে করতে এখানে পৌঁছেছে ভাবতে ভাবতে বিনায়ক ফোস করে একটা শ্বাস ছাড়ল। অন্ধকারে বসে দূরে মেলা মাঠের দিকে তাকালো দূরে আলো করছে লোকের চিৎকার চেঁচামেচি আর বিভিন্ন আখড়ার গানে চারিদিক মুখরিত।

বিনায়ক আজও অন্ধকারে ঘড়ি দেখল দশটা পনেরো খেয়া পারাপার সারারাত চলে এই কয়দিন। মাঝিদের বিশ্রামের সময় নেই। পুলিশও সমানভাবে জেগে থাকে। সতর্ক দৃষ্টি নিয়ে এখনো পর্যন্ত কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি দুর্ঘটনায় সে পড়ল। বুকের পাঁজর ভেঙ্গে গেল এসব কি সব সত্যি ধাক্কা লাগা থেকে এই পাম্প হাউসের ঘটনাগুলো কি? মিথ্যে মিথ্যে কি শঙ্করীর সেতি দাগ দেখা আবার হঠাৎ করে তার কোল থেকে শঙ্করের অন্তর্দান না মাথায় কিছুই ঢুকছেনা বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দিতে সিগারেট আবার মেলা মাঠের দিকে তাকাল, অমনি চমকে উঠল, কে যেন এদিকে আসছে। হয়তো কেউ মেলা দেখে দূরের গ্রামে ফিরে যাচ্ছে।

বিনায়ক নড়ে চড়ে বসল। আবার আশায় বুক বাধল। কে যেন রাস্তা থেকে নিচে নেমে এদিকে আসছে ধীরে ধীরে ছায়াটা কাছে এসে সামনে দাঁড়াল। একটা কম্বল ছুড়ে দিল, ভেবেছিলে পালিয়ে গেছি।

বিনায়ক অন্তরঙ্গ সম্বোধনে অবাক হয়ে শঙ্করীকে দেখতে লাগল।

শঙ্করী পাশে বসে একটা ব্যাগ মেঝেতে রাখল।

বিনায়ক চুপ করে রইল। শঙ্করী আবার বলল, এগুলো আনার দরকার ছিল।

বলে যেতে পারতে।

বললে যেতে দিতে না।

হয়তো দিতাম না। কিন্তু...

বিনায়ককে বাধা দিয়ে শঙ্করী বলল, আখড়ায় গিয়ে মনটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগল। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। মনে হচ্ছিল কি যেন হারিয়ে ফেলেছি। বলতে বলতে ওর গলা বুজে এল।

আমি জানতাম তুমি আসবে।

জানতে?

জানতাম। তাইতো তোমায় খুঁজতে যাইনি। বিনায়ক বলল, যে নিজে হারাতে চায়, তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। বলেই হাত বাড়াল।

 শঙ্করী ধীরে ধীরে হাত বাড়াল।

বাইরে হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হল। বৃষ্টি অঝোরে পড়ছে। তাতেই মেলা মাঠে চারদিকে লোকজন ছোটাছুটি করছে। বিনায়ক দূর থেকে দেখতে পেল। দেখতে দেখতে শঙ্করীকে কাছে টেনে কম্বলে ঢেকে একটা স্বস্তির শ্বাস ছাড়ল।
গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা এখানে প্রকাশিত লেখক, অতিথি ও অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য ও মতামত একান্তই তাঁদের নিজস্ব। এসব বক্তব্য বা মতামত Poorvam-এর নীতি, অবস্থান বা মতামতকে প্রতিফলিত করে না।
স্বত্ব ও লাইসেন্স: এই রচনাটি Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International (CC BY-NC-ND 4.0) লাইসেন্সের আওতায় প্রকাশিত। মূল লেখকের নাম ও ‘আনুপূর্বী’ পত্রিকার সূত্র উল্লেখ সাপেক্ষে অবাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত।
creative commons

আমরা তথ্যের অবাধ মুক্ত প্রবাহে বিশ্বাসী

ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে আমাদের লেখা বিনামূল্যে অনলাইনে বা প্রিন্টে পুনঃপ্রকাশ করুন।

Bhabaranjan Biswas B
লেখক পরিচিতি
প্রোফাইল →

Bhabaranjan Biswas

**ভবরঞ্জন বিশ্বাস** বাংলা কথাসাহিত্যিক। ১৯৯১ সালে তাঁর প্রথম গল্প ‘রক্তক্ষরণ’ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁর প্রায় তিনশো ছোটগল্প ও দশটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর প্রথম গ্রন্থ *ধস* (২০১৪); পরবর্তী প্রকাশনা *গল্প ১৫* (২০২৫) ও *কষ্টে আছি* (২০২৬)। সমাজজীবন, মানবসম্পর্ক এবং নর-নারীর জটিল সম্পর্ক তাঁর সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য বিষয়। ছোটগল্পের জন্য তিনি যমুনা করুণা স্মৃতি সম্মান, রামমোহন স্মৃতি রঞ্জিত পাল সাহিত্য পুরস্কার এবং দীপঙ্কর ঘোষ স্মারক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।

আরও পড়ুন

গল্প 15 মিনিট

দশহরা