Skip to main content
Search
Author
Literature · 19 Sep 2026 · বাংলা · Anupurvi

বাড়ির খসড়া

বাড়ির খসড়া
অতিথি-শিক্ষক হয়ে রাবং-এ আসা স্থপতি শাওন থাকার জন্য একটি অদ্ভুত বাড়ি পায়। বাড়িটির নকশা কোনো পরিচিত জ্যামিতি মানে না, আর দরজার পাশের আলমারিতে আগের ভাড়াটিয়াদের নীল খাতা সাজানো। নিয়ম একটাই: বাড়ি ছাড়ার সময় নিজের খাতাটি রেখে যেতে হয়। ল...

পাহাড়ি শহরে এমন বাড়ি শাওন আগে দেখেনি। একতলা – কিন্তু কোনো পরিচিত জ্যামিতি মানে না। না বর্গ, না আয়ত, না গোল। দেখে মনে হয় যেন ভাঁজ-খোলা মানচিত্র — কোথাও রেখা টেনে সোজা গেছে, আবার কোথাও হঠাৎ ভেঙে এক চিলতে বাঁকে ঢুকে পড়েছে। মুখ্য দরজার পাশে চৌকো একটি জানলা; তার গায়ে বসানো ত্রিভুজ কাচ, যা দিনের বেশির ভাগ সময় আলো ঢুকতে দেয় না। সবকিছু মিলিয়ে বাড়িটা যেন নিজের আকার ঘোষণা করেও লুকিয়ে রাখে শাওন এসেছে রাবং — নামচি থেকে ওপরে। তিন মাসের জন্য অতিথি-শিক্ষক হিসেবে। হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা আছে, কিন্তু ওর বিভাগীয় প্রধান খুব উৎসাহ নিয়ে বলেছেন, “একটা বিশেষ বাড়ি আছে, অনেকদিন আগের ডিজাইন। ফ্লোরপ্ল্যান একটু বাঁকা... আপনি তো আর্কিটেক্ট; দেখুন কিরকম লাগে।” হাঁটতে হাঁটতেই পাহাড়ি ঠাণ্ডা শ্বাস ফেলছিল শাওন। মাথার ভেতরে ভেসে উঠছিল কলকাতার আঁটসাঁট অলি, খোলা খাতা, অসম্পূর্ণ নকশা। শোবার ঘরে ঢুকে প্রথমেই নজরে এল — দরজার ঠিক বিপরীতে একটা ছোট্ট আলমারি, তার গায়ে নীল কাগজের খাতা। দরজার পাশে পেরেক ঠুকে ঝুলিয়ে রাখা। কভারগুলো প্রায় একরকম। পুরনো তারিখ, পুরনো মানুষ— “নীলাঞ্জন মহাপাত্র, শীত ২০১৯”, “সুমিতা আরুল, বর্ষা ২০২১”, “ধনঞ্জয় ত্রিপাঠি, গ্রীষ্ম ২০২৩”, আর “শাওন ভট্টাচার্য, শীত ২০২৫” – যেখানে এখনও কিছু লেখা হয়নি।

স্থানীয় একজন শাওনকে পৌঁছে দিয়ে চলে যাওয়ার সময় বলেছিল, “এখানে যারা থাকে, তারা সবাই একটু-আধটু লেখে। আগের ভাড়াটিয়া নাকি ডায়েরির মত লিখে গেছেন, আপনি ইচ্ছে করলে পড়তে পারেন। আমরা তেমন কিছুই বুঝি না, শুধু বাড়িটা ছাড়তে গেলে নাকি নিজের খাতাটা রেখে যেতে হয়।”

শাওন প্রথম রাতে শুধু নিজের নাম লেখা খাতাটা হাতে নিয়ে দেখেই রেখে দেয়। অবসর ছিল না। নতুন জায়গা, কলেজ, কাগজপত্র, অনলাইন ক্লাস—এরপর মাথা বালিশে পড়তেই ঘুম নেমে এল।

দ্বিতীয় রাতে বৃষ্টি। বাড়ির মাথায় টিনের চাল, টুপটাপ শব্দ। সাড়ে দশটার পর শাওন টেবিলের আলো জ্বেলে ল্যাপটপ খুলে বসে। পাশে রাখা ডায়েরি। সাধারণত সে মাইক্রোসফট ওয়ার্ডেই লেখে; ইদানীং অভ্যাস হয়েছে ‘DraftMe’ নামে একটি অ্যাপ ব্যবহার করার। অদ্ভুত এই সফটওয়্যার, আগের লেখাগুলো দেখে লেখকের শৈলী শিখে, তারপরের বাক্যটুকু অনুমান করে অটোসাজেশন দেয়। মাঝে মাঝে নোটিফিকেশন দেখায়, “পরের লাইনটা কি এইরকম হতে চলেছে?” প্রথমদিকে ব্যাপারটা মজার মনে হত; পরে উত্তেজনাও— যেন নিজের চিন্তাশক্তির খুব কাছাকাছি আর একটা মাথা, যা সিদ্ধান্ত নেবার আগে লাইনগুলো পরীক্ষা করে দেখছে।

আজ নতুন বাড়ির কথা লেখার জন্য সে খাতার বদলে DraftMe-তে পেজ খোলে। কী লিখবে জানে না; তবু আঙুল দিয়ে টাইপ করে— “শহরের এই বাড়িটা একটু বেঁকে আছে।”

ইন্টারনেট দুর্বল; তবু কয়েক সেকেন্ড পর DraftMe নিজে নিজে লিখে দিল – “বারান্দা থেকে ওপরে যাওয়ার সিঁড়ির মাঝে সবকটা ধাপ সমান না।” শাওন চমকে গেল। সে তো সিঁড়ি দেখেনি এখনও। তবু ফাঁকা খাতায় নোট করে রাখে— “কাল দেখে আসব সিঁড়ি আছে কি না।” 

বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে কোথা থেকে যেন টক করে ধাতব একটা শব্দ এল কানে। যেন কেউ নিচতলায় লোহার কিছু মেঝেতে ছুঁইয়ে রাখল। এ বাড়িতে তো সেদিন দেখেইছিল কোনো নিচতলা নেই। ঘুমের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে শাওন একবার ভাবল, “হয়তো বাড়ির কোথাও লুকনো একখানা সিঁড়ি আছে।”

তারপর ঘুম এসে সবকিছু এক-সমান করে দিল।

পরদিন ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। ছোট শহরের বাজার বন্ধ হয়ে এসেছে; দূরে পাহাড় অন্ধকারাচ্ছন্ন।

বাড়ির গেটের পাশে আজ এক নতুন মুখ দেখা গেল। অল্পবয়সী এক পাহাড়ি ছেলে। “নতুন গার্ড?” – শাওন হেসে জিজ্ঞেস করল। ছেলেটা মাথা নাড়ল। ছেলেটির মুখে সহজ হাসি, কিন্তু চোখ দুটো খুব বেশিরকম স্থির।

ঘরে ঢুকে ব্যাগ রেখে, হঠাৎ কাল রাতের DraftMe-এর কথা মনে পড়তেই, বারান্দার ভেতরের দিকে তাকাল শাওন। বাঁ-দিকে দেয়াল ছুঁয়ে একটা সরু করিডর গিয়ে শেষ হয়েছে একটা দরজায়। দরজার ওপারে যেন কালো ফাঁকা। শাওন টর্চটা তুলে নিয়ে এগিয়ে গেল। দরজা ঠেলতেই সামনের অল্প অন্ধকারের ভেতর থেকে ওপরে উঠে গেছে একটা সিঁড়ি— কংক্রিটের, সাদা সিমেন্ট মাখা। শুধু অদ্ভুত— প্রতি পাঁচ ধাপের পর হঠাৎ একটা, দুটো ধাপ বাদ গেছে। যেন ৫, ৬, ৭ নেই; ৫-এর পর সোজা ৮। মাঝের ফাঁকায় পা দিলে মনে হয় শূন্যে পা পড়েছে, তবু গিয়ে ঠেকছে কংক্রিটেই।

শাওন সিঁড়ির মাথায় পৌঁছে দেখল আরেকটা ছোট ঘর, ত্রিভুজাকৃতি। দুটি দেয়াল কোণে গিয়ে লেগেছে, তৃতীয় দেয়ালের মাঝে খুব ছোট একটা জানলা… সেখান থেকেও কোনও আকাশ দেখা যায় না, শুধু অন্য এক বাড়ির ফাঁক আর সামান্য কুয়াশা। ঘরে কোনো আসবাব নেই। শুধু কোণে একটা লোহার লাঠি ঠেস দিয়ে রাখা। টর্চের আলো লাঠির মাথায় পড়তেই পুরোনো রুপো যেন চমকে উঠল। হঠাৎ নিচে, বাথরুমের দিক থেকে জলের শব্দ থেমে গিয়ে একটা টক্‌ করে ধাতব আওয়াজ।

শাওন তাকাল সেদিকে। কেউ নেই; তবু ঘাড়ের কাছে কেমন হালকা কাঁপুনি ওঠে।

ঘরে গিয়ে ল্যাপটপ খুলতেই, শাওন নিজে কিছু লিখবার আগেই স্ক্রিনে নতুন একটা প্রম্পট উঠল— “শিরোনাম: খসড়া বাড়ি”। সে নিজের আঙুল সরিয়ে নেয় যাতে ‘accept’ না করে ফেলে, কীবোর্ড থেকে একটু সরিয়ে নিল নিজেকে। কিন্তু শিরোনামের নিচে ছোট ছোট অক্ষরে লেখা চলতে শুরু করল— “আজ আমি সিঁড়িটা দেখে এলাম। সিঁড়ির ফাঁকগুলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, আমি আগেও এখানে এসেছি। কোণের ত্রিভুজ ঘরটায় একা দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মনে হল কেউ আমার খাতায় আগে থেকেই লিখে রেখেছে এখানে উঠে আসার কথা।”

শাওন হঠাৎ ল্যাপটপের ঢাকনা চাপা দিল। স্ক্রিন নিভে গেল, শব্দ থামল; কিন্তু মাথার ভিতর সেই একটা ভাবনা চলতেই থাকল, আলতো, কাঁটা-দেওয়া অক্ষরে— “কেউ খাতায় আগে থেকে লিখে রেখেছে…” সে উঠে গিয়ে দরজার পাশে ঝুলে থাকা খাতাগুলো থেকে নিজের খাতাটা নামিয়ে নিল। পেন হাতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে প্রথম পাতায় লিখল— “আমি শাওন। এই বাড়িটা সম্পর্কে আমার আগে কোনো স্মৃতি ছিল না।” পরের লাইনে অসাবধানতায় পেন থেকে কালির দাগ পড়ে গেল; দাগটা ছড়িয়ে উঠতে উঠতেই শব্দ হল — টক! লোহার লাঠির মতো।

কয়েকদিন এমনভাবেই কেটে গেল— দিনে কলেজ, ক্লাস; বিকেলে শহরের গলি ঘুরে দেখা, রাতে ফিরে বাড়ির ভিতরে নিঃশব্দ সিঁড়ি, ত্রিভুজ ঘর, ডায়েরি।

বাড়ির গেট পাহারা দেয় অশ্বিন। চারপাশে পাহাড়ি কুয়াশা। একদিন সে মুখ গুঁজে বসে আছে, শাওন তার কাছে এই বাড়ির আগের লোকজন সম্পর্কে জানতে চাইল। অশ্বিন হাসল, “কিছু কিছু। একজন মাস্টারমশাই ছিল, একজন আঁকার টিচার, একজন নাকি লেখক ছিল। সবাই রাতের দিকে একটু… আলাদা হয়ে যেত। একা একা সিঁড়ি দিয়ে যেত ওপরে।” “তারা সবাই কি ডায়েরি লিখত?” একটু চিন্তিত মুখে জিগ্যেস করল শাওন। অশ্বিন একটু গলা খাটো করে বলল, “হ্যাঁ, তবে তারা শুধু ডায়েরির কাগজে না, আমার মাথার মধ্যেও লিখে গিয়েছে কিছু বাক্য।” শাওন ভুরু কুঁচকে চেয়ার টেনে বসল পাশে। অশ্বিন সিগারেট না জ্বালিয়ে হাতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ফিসফিস করল, “কখনও কখনও রাতে গাছটার পাশে দাঁড়ালে দেখি, কেউ নেই তবু শব্দ হয়— ধাতুর। আমার বাবাও আগে এখানে গার্ড ছিল; মারা যাওয়ার আগে বলেছিল যে এই বাড়ি নিজের পছন্দের লোক খুঁজে নেয়। তারা আসে, চলে যায়। বাড়ি থাকে। কিছু নাম থেকে যায়।… আপনি খাতায় যাই লিখছেন, সাবধানে লিখবেন।”

কয়েকদিন পর এক ঝড়ের রাতে সবকিছু কেমন পাকিয়ে গেল। বিকাল থেকে আকাশ কালো; আগেভাগেই ছুটি হয়েছে। শাওন ঘরে ফিরে এসে দেখল— ওয়াই-ফাই পুরো বন্ধ, ফোনে নেট নেই। ল্যাপটপ খুলল DraftMe খুলবে বটে, কিন্তু সার্ভারের সঙ্গে কথা বলতে পারবে না। সে খাতাটা টেবিলে রেখে কলম হাতে বসল।

বাইরে বাতাসে টিনের চাল নেচে উঠছে, বাড়ির মধ্যে যেন অল্প কাঁপুনি। শাওন খাতায় লিখল— “আজ ওদের কাউকেই বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে না… না এই বাড়িকে, না DraftMe-কে, না নিজের স্মৃতিকেও।” লিখে থামতেই হালকা কালির ফোঁটা পড়ল আর একবার। টক্‌।

সেই শব্দের সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়ির দিক থেকে, খুব আস্তে হেঁটে যাওয়ার আওয়াজ এল— কংক্রিটের উপর খালি পা যেন। শাওন উঠে দাঁড়াল। হৃদপিণ্ড এত জোরে ধুকপুক করছে যেন বুকের হাড় ভেদ করে বেরিয়ে আসবে।

সিঁড়ির মুখের দরজাটা আধখানা খোলা। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে, সিঁড়ির মাঝের ফাঁকগুলো আজ যেন আরও বেশি বড়। শাওনের ইচ্ছে করল আগের অতিথিদের খাতাগুলো পড়তে। এখনই পড়া দরকার। নিচে নেমে দরজার পাশে আলমারিটা খুলে বসে গেল।

প্রথম খাতা—নীলাঞ্জনের। লিখেছে, “প্রথম সপ্তাহটা খুব ভালো। দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বাড়িটা মাঝে মাঝে নিজের ভেতরের পথ বদলাতে শুরু করল। একদিন রাতে উঠে দেখি, যে জানলা দিয়ে সকালে পাহাড় দেখা গেছে, সেটা এখন আরেকটা বাড়ির দেয়ালের দিকে মুখ করে। নিজের আঁকা ফ্লোরপ্ল্যান মিলিয়ে দেখলাম—কাগজে বাড়িটা যেমন, বাস্তবে তেমন নেই। আমি নাকি খাতায় আগে থেকেই লিখে রেখেছি— ‘বাড়িটা বদলাবে।’ মনে মনে লিখেছিলাম। কিন্তু খাতায়ও লেখা আছে। আমার হাতের লেখায়...”।

দ্বিতীয় খাতা সুমিতার - “আমি আমার ছোটবেলার পাহাড়ি গাছ নিয়ে গল্প লিখছিলাম। লেখাটা শেষ হওয়ার আগে দেখলাম, বাগানের গাছের ডালগুলো লেখার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে— যেখানে আমি ভুল বানান লিখেছিলাম, সেখানকার ডালটা অদ্ভুতভাবে নুয়ে গেছে… মাঝরাতে কোনো শিশু শূন্যে স্কিপিং করছে দেখলাম, গাছের গায়ে লাগানো অদৃশ্য দড়িতে। সকালে উঠেই মাথা পরিষ্কার। শুধু খাতায় অনেককিছু লিখেছি, কখন লিখেছি জানি না।”

আরেকটা খাতার ভিতরে শুধু ছড়ানো ছিটানো বাক্য— “সিঁড়ির ফাঁকগুলো… আগেও পেরিয়েছি…”, “গার্ডের মুখ একই, নাম বদলেছে…”, “বাড়ি বলতে চায়, ‘তুমি এখানে আগেও ছিলে।’” শাওন বুঝতে পারল না, কখন তার গা দিয়ে ঘাম বইতে শুরু করেছে। মাথায় যেন কেউ DraftMe-র অদৃশ্য সংস্করণ লাগিয়ে দিয়েছে— যা তার আগের সব পড়া, দেখা, শোনা কথাকে একত্র করে এখন পরের লাইন সাজেস্ট করছে। আর সেই লাইনটাকে সে যেন এড়াতে পারছে না— “আমি এখানে আগেও এসেছি।”

বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। শীত ২০১৪-তে শাওন নামচির এক পাহাড়ি গ্রামে প্রজেক্টে গিয়েছিল, কিন্তু এ শহরে আসার কথা মনে পড়ে না। কলমটা হাত থেকে পড়ে গেল। টক্‌। শব্দের সঙ্গে সিঁড়ির দিক থেকে ধীরে ধীরে আলো নড়ে উঠল।

সিঁড়ির অদ্ভুত ফাঁক গুলো পেরিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে শাওন ভাবল যদি সত্যিই ২০১৪ সালে সে এখানে থেকেও ভুলে গিয়ে থাকে?

ওপরে ত্রিভুজ ঘরটার দরজা খোলা। মেঝেতে একটা ছোট টেবিল, ওপরে খোলা খাতা, খাতার পাশে জ্বলছে মোমবাতি। পাশে দাঁড়িয়ে অশ্বিন। অথবা, অশ্বিনের মতো দেখতে কেউ। চোখ দুটো একইরকম স্থির; শুধু জ্যাকেটটা একটু আলাদা। “আপনি একদম ঠিক সময়ে এসেছেন,” সে বলল। “কেন?” শাওনের গলা শুকিয়ে এসেছে। “এই খাতাটা আপনার,” ছেলেটা বলল। খাতার পাতায় লেখাগুলো অবিকল শাওনের নিজের হাতের লেখার মতো। “এখানে তারিখ ২০১৪ লেখা, এখন ২০২৫,” সে ফিসফিস করল। “সেটা তো এই নতুন খসড়ার তারিখমাত্র। এই বাড়ি একই মানুষকে একাধিকবার ডাকে,” অশ্বিন বলল, “কেউ আসে অতিথি-শিক্ষক হয়ে, কেউ লেখক হয়ে, কেউ পর্যটক। দুঃখের বিষয়, আপনি প্রত্যেকবারই ভাবেন—এটা আপনার প্রথম আসা।”

শাওন খাতার পাতায় চোখ নামাল। লিখেছে কে? সব অক্ষর যেন অন্য কোনো সময় তার নিজের হাতে লেখা। “আমি কি এখানে মারা গিয়েছিলাম?”—প্রশ্নটা অদ্ভুতভাবে বেরিয়ে এল মুখ থেকে। অশ্বিন হাসল, “মৃত্যু আলাদা। আপনি এখানে প্রতিবারই শেষ করে গেছেন একটা করে গল্প; এখানে সেই সব খসড়া রাখা আছে। পরেরবার আপনি অন্য নামে, অন্য ভূমিকায় এসে সেই খসড়ার ওপর নতুন লাইন লিখে যান। আপনিই আমাকে আগে বলেছিলেন, আমি অশ্বিন নই; আমি আগের এক গল্পের পাহারাদার। আমার কাজ আপনাকে শুধু আবার সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেওয়া।” শাওন ঘুরে দেখল, ত্রিভুজ ঘরের দেয়ালে হেলান দিয়ে থাকা লোহার লাঠিটা একবার হালকা কেঁপে উঠল। টক্‌। মোমবাতির আলো কাঁপল।

নিচে নামার সময় সিঁড়ির ফাঁকগুলো আর তেমন ভয় লাগল না। খাটের পাশে DraftMe-র স্ক্রিন জ্বলজ্বল করছে। নেট নেই, অটোসাজেশনের ব্লক ঝুলে আছে… এই পর্যন্ত লিখে শাওন ভাবল, আর লিখবে না। অথচ স্ক্রিনটাকে ছেড়ে সে আবার খাতা নিয়ে বসেছে। মোমবাতির আলো এখন টেবিলের উপর। পেনটা হাত থেকে আলগা হয়ে এল। কালির ফোঁটা খাতার কাগজ স্পর্শ করতেই মনে হল, বাড়িটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। মোমবাতির আলো একটু উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

পরদিন সকালে শাওন কলেজে গেল, ক্লাস নিল। কোনো আলোচনায় সে বাড়িটির কথা তুলল না; পাহাড়ি শহরের নিখুঁত সমকোণগুলো, সরল রাস্তা, সোজা নকশা নিয়েই কথা বলে গেল। বিকেলে সেদিন ওনার বিভাগীয় প্রধানকে নিয়ে ফিরে দেখল, ঢোকার মুখে দরজার সামনে চেয়ারটা খালি। “অশ্বিন আসেনি”, আস্তে আস্তে বলল শাওন। তিনি একটু অবাক হয়ে বললেন, “অশ্বিন? ওই নামে তো কোনো গার্ড আমাদের নেই এখন। সে নাকি এখানে কাজ করত তার বাবার সঙ্গে। বাবা মারা যাওয়ার পর ছেলেটাও আর আসে না।” শাওন কিছু বলল না আর এই প্রসঙ্গে তখনকার মতো।

রাতে যখন একা বসে আছে খাটের ওপর, দরজার পাশের আলমারির দিকে সাদা খাতাগুলোর মাঝে তার নিজেরটা একটু সামনের দিকে বেরিয়ে আছে। সে খাতাটা জায়গামত ঠেলে ঢুকিয়ে রাখল। বাইরে দেবদারু গাছের ডাল নড়ছে হাওয়ায়। তার ওপরে কোনো অদ্ভুত, অচেনা পাখি বসে। দেখলে মনে হয়, যেন একবার দেখেছে আগেও কোথাও— কোনো পুরোনো গল্পের খসড়ায়।

শাওন সিদ্ধান্ত নিল— কলকাতায় ফিরেও এই বাড়ি নিয়ে কিছু লিখবে না। DraftMe খুলেও না, কাগজে কলমেও না। কিন্তু সে যা ভাবছে, তার বাইরে বাড়িটা নিজে থেকে একটু একটু করে লিখে যাচ্ছে দুপুরের রোদ, রাতের বৃষ্টি, পাহারাদারের পায়ের শব্দ, ত্রিভুজ ঘরের অন্ধকার, খসড়একদিন কোনো আরেকজন অতিথি-শিক্ষক, অন্য নাম, অন্য জীবন নিয়ে, এই বাড়িতে এসে দরজার পাশে আলমারিটা খুলবে, আর নিজের নামের নিচে হয়তো হঠাৎ একটা অতিরিক্ত লেখা লাইন দেখে থমকে যাবে। বাড়ি তখন চুপচাপ, কেবল দেওয়ালের ভিতর দিয়ে কোথাও একবার ধাতুর টক শব্দ হবে, শুরু

হবে আরেকটা নতুন খসড়া।

া নামগুলোর তালিকা…

Discipline / Topic বাংলা
More by DEBASMITA SARKAR View all works →

Explore more on Charcha

Discover the latest writings, journal papers, talks, and literary discussions from all Poorvam contributors.

Go to Charcha feed

Publish with Poorvam

Double-blind peer review, open access, and a platform built for Indic scholarship.